home বই পরিচিতি এক সুইস বিনোদিনীর জীবনকাহিনি | আসিফ হাসান

এক সুইস বিনোদিনীর জীবনকাহিনি | আসিফ হাসান

ঘটনার সূত্রপাত সুইজারল্যান্ডের দাভোজ শহরে। রাজধানী জুরিখ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই শহরটি ভ্রমণকারীদের তীর্থস্থান বলে পরিচিত। এ শহরেই আছে ৫ ও ৭ তারকা মানের পৃথিবীখ্যাত কয়েকটি হোটেলের  শাখা। তেমনি একটি স্টাইগেনবার্গার গ্র্যান্ড হোটেল বেলভেদ্রে। লেখক এখানেই চাকরি করতেন নাইট অডিটর পদে। সময় ২০০৪ সাল। একদিন রাতের প্রায় শেষ প্রহর, হোটেলের লবিতে খুব মৃদুলয়ে বাজছে মীর্জা গালিবের গজল-

 

আহ্ কো চাহিয়ে এক ওমর আসর হোনে তক্

কওন জীতা হ্যায় তেরে যুলফ কে সর হোনে তক

(একটি দুঃখের যন্ত্রণা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত থাকে,

তোমার কেশের বেণী বাঁধা পর্যন্ত কে বেঁচে থাকবে?)

 

এমনি সময়ে হোটেলের সিঁড়ি বেয়ে, খুব ধীরপায়ে নেমে আসছেন ক্লান্ত আর বিদ্ধস্ত এক নারী। লেখক তারই প্রতীক্ষা করছেন সেই মধ্যরাত থেকে। হোটেলের ডিরেক্টর নেলসন সাহেব তার খবর রাখতে বলেছেন। কারণ আজ রাতে পৃথিবীর প্রভাবশালী একজন রাষ্ট্রনায়ক ভ্লাদিমির পুতিনের এক ধনকুবের বন্ধুর শয্যাসঙ্গীনি হবার কথা তার। পূর্বের অভিজ্ঞতায় নেলসন আশঙ্কা করেছিলেন মেয়েটি আজও হয়ত ক্ষতবিক্ষত হতে পারে সেই দানবীয়, আদিম লালসার কাছে। লেখক তাকে প্রথম দেখলেন। নেলসনের আশঙ্কাই সত্যি। কী নিষ্ঠুর পাশবিকতায় মেয়েটি ক্ষত-বিক্ষত। তিনি পরম মমতায় কিছুটা শুশ্রুষা করলেন এবং মেয়েটিকে বাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন।

কাহিনির শুরু এখানেই। লেখকের বর্ণনায় অসম্ভব রুপসী এক ভদ্রমহিলা। নাম তার মিরিয়াম জোনাথন। সে এই হোটেলের নথিবদ্ধ একজন কম্পেনিয়ন বা রুপোপজীবিনী। মিরিয়াম জোনাথনের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্র ধরে লেখকের মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত আবেগই এই কাহিনির মূল উপজীব্য। লেখকের তরুণ বন্ধু কবি শিমন রায়হান ঘটনার সামান্য কিছু শুনেই অনুরোধ করেন এই কাহিনি নিয়ে উপন্যাস লেখার। শিমনের কয়েকবারের অনুরোধে লেখক তার বর্তমান ঠিকানা জার্মানির নয়ে-ইজেনবুর্গ শহরে বসে লেখা শুরু করেন তার জীবন থেকে নেওয়া এই আখ্যান।

মিরিয়াম জোনাথনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সুইজারল্যান্ডের জুরিখের একটি গোড়া ক্যাথলিক খ্রিস্টান পরিবারে। পড়াশোনা, কর্মজীবন সেখানেই। ব্যাংকার বাবার সংসারে জন্ম নেওয়ার ছয় বছরের মাথায় মা মারা যান। বাবা আর বিয়ে করেননি। ইউরোপের মতো দেশে যা একটি বিরল ঘটনা। মায়ের অকালমৃত্যুর পর ডরোথি নামে এক কাজের মেয়ের কাছে মানুষ হতে থাকে মিরিয়াম। অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে জুরিখের একটি ব্যাংকে চাকরিও নেন। হঠাৎ তার জীবনে আসে বহরাম জামশেদি নামের এক ইরানি যুবক। এরপরই মিরিয়ামের জীবনে একের পর এক আসতে থাকে রোমাঞ্চ, দুর্ঘটনা, হতাশা আর না পাওয়ার করুণ অধ্যায়।

সময়টা ’৭০ দশকের মাঝামাঝি। ইরানের ক্ষমতায় তখন রেজা শাহ পাহলভী। তাকে সমর্থন দিচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকার শক্তি। রেজা শাহ’র পতনের জন্য ইরানের প্রবাসী ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনীর আহ্বানে দেশের সিংহভাগ লোক একাট্টা। শাহ সরকার অত্যন্ত  নিষ্ঠুরভাবে তা দমনে ব্যস্ত। বহরাম জামশেদির বাবা আমিন জামশেদি এ সময় ইরানের ক্ষমতাসীন শাহ’র ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য। অপরদিকে, বহরামের মা শাহবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। এই অভিযোগে শাহ সরকার আমিন জামশেদিকে বরখাস্ত করে। খোমেনির নেতৃত্বে বিক্ষোভের মুখে ’৭৯ সালে ইরান থেকে পালিয়ে যান শাহ। সে সময় তেহরানে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ কর্মকর্তা ছিলেন কর্নেল গেরী। তার সঙ্গে সখ্যতার কারণে আমিন জামশেদি তেহরানে মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা বিভাগে যোগ দেন এবং নিরাপত্তার জন্য ছেলেকে নিয়ে দূতাবাসের ভেতরে বাসা-বদল করেন। চারদিকে তখন প্রতিদিনই উন্মত্ত জনতা দূতাবাসের কর্মীদের প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকে। এ অবস্থায় কর্নেল গেরি খুব কৌশলে তেহরানে অবস্থিত সুইস দূতাবাসের সহায়তায় বহরামের জন্য একটি সুইস-পাসপোর্ট যোগাড় করেন এবং জুরিখে তার বন্ধু, মিরিয়ামের বাবা চার্লস জোনাথনের কাছে তাকে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন।

১৮ বছরের বহরাম জামশেদী  তার বন্ধু নাদিরকে নিয়ে তেহরান থেকে ছদ্মবেশে আজারবাইজান, রোমানিয়া, হাংগেরি, অস্ট্রিয়া হয়ে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে মিরিয়ামের বাসায় এসে পৌঁছায়। বহরাম ও তার বন্ধুর জুরিখে পালিয়ে আসার রোমাঞ্চকর বর্ণনা লেখক খুবই নিখুঁতভাবে দিয়েছেন যা মিরিয়ামের কাছে শুনেছিলেন তিনি। দূর্গম অভিযাত্রার মতো শিহরণ জাগানো এই বর্ণনা। মিরিয়াম তখন ষোড়শী। সঙ্গত কারণে যা হওয়ার তাই হলো। বহরামের সঙ্গে প্রেম, শারীরিক সম্পর্ক, গর্ভধারণ অতঃপর বিয়ে। মিরিয়ামের কোল আলো করে আসে লেইলা নামে এক কন্যাসন্তান। শিয়া সম্প্রদায়ে জন্ম নেয়া বহরামের কাছে নারী মানেই ভোগের বস্তু। স্বভাবে চরম উচ্ছৃংখল ও মদ্যপ বহরাম মিরিয়ামকে ভোগের বস্তুর বাইরে কখনই স্ত্রী হিসেবে ভাবেনি।

মিরিয়ামের বাবার মৃত্যুর পরে বহরামের স্বরূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে। গোঁড়া ক্যাথলিক বলে বহরামকে তালাকও দিতে পারে না মিরিয়াম। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে যায় যে, জুরিখ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে দাভোজ শহরে এক প্রকার পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় সে। এখানেই এক রাতে বেলভেদ্রে হোটেলে লেখকের সঙ্গে দেখা হয় তার। প্রথম সাক্ষাতেই মিরিয়ামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন লেখক। কিন্তু সদ্য জার্মান ফেরত লেখক তখন ১৮ বছর একত্রে থাকা বান্ধবীর বিচ্ছেদ যন্ত্রণায় কাতর। তবু মিরিয়ামের প্রচণ্ড ইচ্ছায় হোটেল বেলভেদ্রের সহকর্মী গোরান ও ২০ অনূর্ধ মেরীর সহায়তায় লেখকের সঙ্গে ঘনিষ্টতা তৈরী হয় তার।

একজন নারীর জীবনে যে চাওয়া-পাওয়া থাকে তা থেকে অনেকভাবে বঞ্চিত ছিলেন মিরিয়াম। একমাত্র কন্যা লেইলা ও মাতৃসমা ডরোথিকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে করতে একদিন তাকে সমর্পিত হতে হয় পৃথিবীর আদিম পেশাটির দিকে। প্রথমে তার জীবনালেখ্য পড়তে শুরু করলে হয়ত মনে হবে জগতের অন্য আর দশজন নারীর মতই আটপৌরে আর গতানুগতিক। কিন্তু যতই কাহিনির গভীরে যাওয়া যাবে ততই পাঠকের মন আর্দ্র হয়ে উঠবে মিরিয়ামের করুণ পরিণতিতে। চোখ সজল হয়ে উঠবে মিরিয়ামের দুঃখ-গাঁথায়। তার বর্ণনাতেই জানা যাবে, পৃথিবীর নামকরা কত রথি-মহারথি আর সরকার প্রধান তার শয্যাসঙ্গী হয়েছেন। যাদের মধ্যে ছিলেন লিবিয়ার প্রয়াত শাসক গাদ্দাফি থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জনৈক ধনকুবের বন্ধু পর্যন্ত। হোটেল বেলভেদ্রের পেশাগত চুক্তি ও নৈতিক কারণেই লেখক মিরিয়ামের কোন জীবিত মক্কেলের নাম এখানে প্রকাশ করেননি।

উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে মনে হবে স্বামী বহরামের সঙ্গে তার অনিবার্য পরিণতি হয়েছে বিচ্ছেদে। কিন্তু না; তার পরিণতি এতটাই উত্তেজনায় ঠাসা যে পাঠক প্রতিটি লাইনেই  মনে করবেন- তিনি এক ভয়ানক রহস্য গল্প পড়ছেন। বহরামের সঙ্গে ইরান থেকে পালিয়ে আসা বন্ধু নাদির এই দাভোজ শহরেই ব্যবসা শুরু করেন একটি মদের বার দিয়ে। প্রতিটি রাতই বহরাম ও নাদির আকণ্ঠ মদে আর মেয়েদের নিয়ে মেতে থাকত। ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস এই, যে বহরামের অত্যাচার থেকে বাঁচতে মিরিয়াম দাভোজ শহরে পালিয়ে এসেছিলেন, সেখানেও তিনি তার থেকে রেহাই পাননি। এমনকি একদিন মদ্যপ অবস্থায় মিরিয়ামের অনুপস্থিতিতে বহরাম তার আপন কন্যা লেইলাকেও ধর্ষণ করে যায়। এই মর্মস্পর্শী বর্ণনা এতটাই হৃদয়বিদারক ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যে, তা যে কোনো পাঠককেই আপ্লুত করবে।

কাহিনির প্রতিটি চরিত্রই বৈচিত্র্যময়। মিরিয়ামকে লালনকারী মাতৃসমা ডরোথিও এক সার্বজনীন নারীর রহস্যময় রূপ। সুইজারল্যান্ডের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের পিতৃপরিচয়হীন এই নারী জীবনে বিয়ে করেননি। অনাথ মিরিয়ামকে তিনি মায়ের স্নেহে মানুষ করেছেন। মিরিয়ামের বিয়ের পরে বহরামের হাতে লাঞ্চিত ও ধর্ষিত হয়েছেন তিনিও। এসব সয়েও মিরিয়ামের কন্যা লেইলাকে তিনি মিরিয়ামের মতই আদর দিয়ে বড় করেন। তার জীবনের সকল সঞ্চয় লেইলার নামে উইল করে দিয়ে যান। লেখককে প্রথমদিকে তিনি সন্দেহের চোখে দেখতেন বহরামের মতো মুসলমান বলে। মিরিয়ামের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব কিছুতেই মেনে নিতে চাইতেন না। কিন্তু শেষ সময়ে তিনি লেখককে আপন করে নেন বন্ধুর মতো। জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে নির্বাক ডরোথি টেলিপ্যাথির মাধ্যমে লেখককে বলে যান তার জীবনের না বলা কথা। লেখকের এই বর্ণনা এতটাই প্রাঞ্জল আর নির্মোহ যে, পাঠকমাত্রই তা পড়ে শিউরে উঠবেন। কাহিনির আরো একটি বড় চমক মিরিয়ামের কন্যা লেইলা। বাবা ইরানি, মা সুইস। বংশগতি সূত্রের আবিষ্কারক জীববিজ্ঞানী ম্যান্ডেলের তত্ত্ব অনুযায়ী বাবা-মা’র জিন সন্তান বহন করে। মানব জীবনের জটিল অনেক বিষয়ের যেমন কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, তেমনি  পঞ্চদশী এই মেয়েটির চরিত্রেরও কোনো সরল সমীকরণ পাওয়া যায় না। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তগ্রহণ ও স্বার্থপরতায় মেয়েটি কতখানি পরিপক্ক সে বর্ণনা পাওয়া যায় তার চরিত্র পঠনে।

এটি সেই অর্থে একটি তথাকথিত উপন্যাস নয়। লেখকের জীবন থেকে নেওয়া এই আখ্যান পাঠককে একটি ঘোরের মধ্যে নিয়ে যাবে- এতে সন্দেহ নেই। বহরাম জামশেদির তার নিজের কন্যাকে ধর্ষণের ঘটনা যেমন পাঠককে একটি বড় ধাক্কা দেবে, তেমনি সাত তারকা হোটেলের রুপোপজীবিনী মিরিয়ামের মাতৃরুপী-শক্তিময়ী চরিত্র কাহিনির গভীরে নিয়ে যাবে বিমুগ্ধ পাঠককে। কাহিনির প্রেক্ষাপট থেকে মিরিয়ামের মহাপ্রস্থানের পরও কাহিনি কিছুদূর এগিয়ে চলে লেইলার হাত ধরে; যার চরিত্র তার জন্মদাতা বহরাম জামশেদির মতই দুষ্পাঠ্য ও জটিল। উপন্যাসটিতে সুইজারল্যান্ডের নৈসর্গিক বর্ণনাও ভ্রমণপিপাসুদের তৃপ্তি দেবে। সুইজারল্যান্ডকে অনেকেই ভূস্বর্গ বলে থাকেন। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সেই খোঁজ পাওয়া যাবে ‘বেলভেদ্রের বিনোদিনী’তে। বোহেমিয়ান লেখক আবদুল্লাহ আল-হারুন প্রায় চার দশক ইউরোপ প্রবাসী। বর্তমানে তিনি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের নিকটবর্তী নয়ে-ইজেনবুর্গ শহরে থাকেন। ঘুরেছেন অর্ধেক পৃথিবী। বিচিত্র ও চমকপ্রদ নানা অভিজ্ঞতা তার লেখার অনুপ্রেরণা। মৃত্যুপথযাত্রীদের শেষ সময়ে সঙ্গ দেয়ার ইউরোপীয় সংগঠন হজপিসের সিনিয়র সদস্য তিনি। মৃত্যু ও মৃত্যুসঙ্গ তার লেখালেখির মূল জায়গা। বেলভেদ্রের বিনোদিনী তার প্রথম আত্মজৈবনিক উপন্যাস।



বইয়ের নাম: বেলভেদ্রের বিনোদিনী

লেখক: আবদুল্লাহ আল-হারুন

শ্রেণি: উপন্যাস

প্রকাশক: ঐতিহ্য

প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা, ফেব্রুয়ারি ২০১৯

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য