আর্ট যুদ্ধের চেয়েও শক্তিশালী — শামসিয়া হাসানি | ভাষান্তর : তন্ময় হাসান

শামসিয়া হাসানি। জন্ম ১৯৮৮-তে।  আফগানিস্তানের কাবুলের প্রথম নারী গ্রাফিতি শিল্পী। তিনি আফগানিস্তানের যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভাঙা দেয়াল বেছে নেন আঁকার ক্যানভাস হিসাবে। তার গ্রাফিতির বিষয় মূলত আফগানিস্তানের নারীরা। তাদের যে সংগ্রাম-সাহস তা নানানভাবে তিনি তুলে আনেন। আমাদের গ্রাফিতি সংখ্যার বিষয় হিসেবে আমরা আফগানিস্তানের গ্রাফিতিকে তুলে আনতে চেয়েছি শামসিয়া’র এ সাক্ষাৎকারটির মাধ্যমে। তার এ সাক্ষাৎকার নেয়া হয়  Art Radar পত্রিকা থেকে, ২০১৩ তে। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন তন্ময় হাসান।


 

আপনি কীভাবে আফগানিস্তানে স্ট্রিট আর্ট শুরু করেন?

– আমি প্রথমে শুরু করি ২০১০ এর ডিসেম্বরে,  কাবুলে ‘চু ‘ নামে একজন গ্রাফিতি শিল্পী আসেন ইংল্যান্ড থেকে আমাদের শেখাতে। ওর্য়াকশপটি অর্গানাইজ করেছিলো “কমব্যাট কমুনিকেশন”

আপনার দেশের একজন অগ্রদূত হিসেবে, কী বা কে আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে?

– গ্রাফিতি ওর্য়াকশপের পর আমার মনে হয়েছে, গ্রাফিতির মাধ্যমে আর্টকে মানুষের কাছে নিয়ে আসা  সম্ভব , কারণ গ্রাফিতি সবসময় খোলা জায়গাতে হয়। এমনিতে  আর্ট এক্সিবিশনে তো আমরা সবাইকে আমন্ত্রণ জানাতে পারি না, সবাই আসেও না। তাই কোন এক্সিবিশন  যদি খোলা জায়গায় হয়, সবার জন্য সেটা উপভোগ্য।  আমি চাই যুদ্ধের সব স্মৃতির ওপর রঙ করে যেতে, তাহলেই  আমি মানুষেরর মাথা থেকে যুদ্ধের ভয়ংকর স্মৃতি মুছে দিতে পারব। আমি চাই মানুষ আফগানিস্তানকে তার শিল্পের জন্য মনে রাখুক, যুদ্ধের জন্য নয়।

আপনার মতে স্ট্রিট আর্ট কিভাবে অন্য সমসাময়িক শিল্পের চেয়ে আলাদা? এটা কী বেশি গুরুত্বপূর্ণ?নাকি কম? কেনো?

– আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে, গ্রাফিতি ব্যতিক্রম। যেখানে,  ইউরোপ বা অন্য দেশে গ্রাফিতি বেআইনি।  আফগানিস্তানে,  আমি এটাকে বিভিন্ন বার্তা, আইডিয়া প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করি। সব রকমের শিল্পই এখানে (আফগানিস্তানে) দরকার। তবে গ্রাফিতি যেহেতু  উন্মুক্ত, এটার ইমপ্যাক্ট ব্যতিক্রম, ভালো, মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানো যায়।  এটা আমার মনে হয়।

আপনার পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন আপনার শিল্পের প্রতি? 

– আমার পরিবার এটা পছন্দ করে।  তারা সবসময় আমাকে সাহায্য করে।  তারা কখনো আমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করে না।  তারা পছন্দ করে,  এ নিয়ে আমি খুশি।

আপনার পরিবার কী আফগানিস্তানে?  আপনার জন্মস্থান কোথায়? 

– আমার পরিবার আফগানিস্তানে। আমার জন্ম ইরানে।  ইরান অন্য অনেক দেশ থেকে আলাদা।  ধরুন আপনি ১০০ বছর ধরে ইরানে বসবাস করছেন, তবুও আপনি সেখানের (ইরানের) নাগরিকত্ব পাবেন না।  ইরানে থাকাকালীন আমি চারুকলা নিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারি নি, জাতীয়তার কারণে।  আমরা আফগানিস্তান ফিরে আসি আট বছর আগে।  মূলত আমার পরিবার কান্দাহারে।

কাবুলের রাস্তায় গ্রাফিতি আঁকার সমস্যাগুলো কেমন? 

– এটা ইউরোপ থেকে আলাদা,  সেখানে সবাইকে পুলিশ থেকে সাবধান থাকতে হয়। কাবুলে, আমার পুলিশের সাথে কোন সমস্যা হয় না।  আমার সমস্যা নিচু মানসিকতার মানুষ নিয়ে এবং আমার বড় সমস্যা হচ্ছে নিরাপত্তা।  বিশেষত যখন রাস্তায় থাকি, মনে হয়  এই বুঝি কিছু হয়,  মনে হয় আসা উচিত হয় নি।

স্ট্রিট আর্ট করতে গিয়ে বিস্ময়কর  কী কী খুঁজে পেয়েছেন?

– প্রথমে যখন আমি গ্রাফিতি করবো ঠিক করি,  আমি সরাসরি  বড়,  খোলা জায়গায় শুরু করি নি।  যদি আমি কোন অভ্যন্তরীণ কোন জায়গায় বা কোন কর্নারে করতাম,  তাহলে আমার জন্য সুবিধা হতো ।  এখন আমি সব জায়গায় করে থাকি। আমার কোন ধারণা ছিলো না কী কী সমস্যা হতে পারে।  কারণ, গ্রাফিতি একদম নতুন,  মানুষের ভিন্ন মত থাকবেই।  আমি মানসিকভাবে গালিগালাজ শুনতেও প্রস্তুত ছিলাম,  যারা আর্ট দেখতে পারে না তাদের কাছে।  কিছু মানুষ তাদের আবেগ নিয়ে কথা বলতে আসে,  কিছু মানুষ আমার সাথে আসে সহযোদ্ধা হিসেবে। আবার কিছু মানুষ চায় আমার গ্রাফিতি বন্ধ করতে।

বিস্মিত সবচেয়ে বেশি হয়েছিলাম যখন শুনেছিলাম কেউ বলছে, ” দেয়ালগুলো নোংরা করছো কেনো? ” কিছু মানুষ এটাও চিন্তা করতো যে আমি যা করছি তা ইসলামে অনুমিত কি না।  অন্যরা মনে করে মেয়েদের এসব করা ভালো না ।  খোলা রাস্তায় তো মোটেই না।  আবার একই সময় অল্প হলেও কিছু মানুষ আমার ছবি আঁকা খুব পছন্দ করে।

একজন মেয়ে হিসেবে আফগানিস্তানে যখন গ্রাফিতি করেন,  কী ধরনের প্রতিক্রিয়া পান?  আপনি কি হুমকির মুখে থাকেন বা ভীত থাকেন? বা প্রশংসা পেয়েছেন? 

– নানা ধরনের মানুষ নানান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখে আমার কাজ।  কিছু মানুষ জানার খুব আগ্রহ দেখায়,  যে এটা কি?  এটা খুব ভালো লাগে।  কেউ কেউ আছে যারা পছন্দ করে, কিন্তু বুঝে না বিষয়টা। আরেক শ্রেণির লোক আছে, বলে ”এসব তো হারাম”,  “দেয়াল নোংরা করতেছো কেনো? ” এরা ভাবে আমি প্রচণ্ড স্বাধীন,  আমার খেয়ে-দেয়ে কোন কাজ নাই , তাই দেয়াল নোংরা করে বেড়াই।  অনেকে অনেকভাবে দেখে।

“ড্রিমিং গ্রাফিতি ” সম্পর্কে কিছু বলুন এবং এই টেকনিক ব্যবহার করার আইডিয়াটা কীভাবে পান? 

– আমি সবসময় ভালো সুযোগ পাই নি বাইরে গ্রাফিতি করার।  দুই তিন মাসে একটি সুযোগ পাই । কখনো নিরাপত্তার অভাবে যেতে পারি না। কখনো সেখানের মানুষের জন্য।

আমি সিদ্ধান্ত নিই ডিজিটাল ইমেজ ব্যবহার করার এবং তারপর আমার স্টুডিওতে গ্রাফিতি করতে পারবো।  আমি ছবিগুলোর উপর ব্রাশ করে গ্রাফিতি করতে পারবো এবং রঙ ব্যবহার করতে পারবো।  তাই এটা আমার কাছে অনেকটা ” স্বপ্নের গ্রাফিতি “। এটা শুধু আমার মনে মনে,  বাস্তব নয়।

আপনি কিংবা অন্য কেউ কি তরুণ আফগান শিল্পীদের মেন্টরিং করছেন? 

– হ্যাঁ,  আমি ওদের গ্রাফিতি করা শেখাতে চাই। এটাতো কোন ফরমাল ক্লাস না যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিতে পারবো। তাই আমরা যদি ওয়ার্কশপ  অ্যারেঞ্জ করি, অইখানেই গ্রাফিতি শেখাতে পারবো। তখন  তারা নিজেদের মতন করে গ্রাফিতি করতে পারবে।  তরুণরা এটা খুব পছন্দ করে।  কারণ এটা সম্পূর্ণ নতুন ধারার শিল্প। এটি কাগজের ড্রয়িং থেকে  আলাদা এবং  যত বড় ইচ্ছা করা যায়।

আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, অইখানে আমি সবচে ইয়ং এবং ওয়ার্কশপের অধিকাংশ শির্ক্ষাথীই আমার বয়সী। ওদের বয়স ধরেন ২০ থেকে ২৬ এমন।

আফগানিস্তানে  শিল্প বা ইতিহাসের উপর  আগ্রহ কেমন? 

– এখানে মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ের একটা ট্রাডিশন আছে। শুরু করেছিলেন কামালউদ্দীন বেহজাদ । তিনিই  আফগানিস্তানে প্রথম মিনিয়েচার আর্টিস্ট। উনার জন্ম হেরাতে।  উনি লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির সমসাময়িক।  লিওনার্দো যখন ইউরোপে ছবি আঁকছিলেন, কামালউদ্দীন তখন  ছবি আঁকছিলেন আফগানিস্তানে।

আফগানিস্তানে কি ভিজুয়াল আর্ট পড়ানো হয়?  

– হ্যাঁ, পড়ানো হয়।  কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মান্ধাতার আমলের শিক্ষাব্যবস্থার কারণে কিছু সমস্যা আছে।  বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ক্ল্যাসিকাল কিছু জিনিস শেখানো হয়। আস্তে আস্তে কনটেম্পরারি আর্টসহ নানান বিষয় আসবে।

আমি নিজেও তো কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার একজন শিক্ষক।  শিক্ষার্থীরা যখন জানতে পারলো আমি গ্রাফিতি করছি, তারা শেখার আগ্রহ দেখালো।  গতবছর আমি একটি ওয়ার্কশপ  করেছি তাদের জন্য।  প্রতি বছর আমি এই গ্রাফিতি ওয়ার্কশপ চালিয়ে যেতে চাই কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আর গ্রাফিতি শেখাতে পারবো না। আফগানিস্তানে এখন প্রচুর নতুন শিল্পী রয়েছে।  ৮ বছর আগে আমি যখন আফগানিস্তানে আসি, তখন কোন ভালো শিল্প বা শিল্পী দেখতে পাই নাই। এখন সবকিছু উন্নত হচ্ছে এবং এখন আফগান শিল্প আগের চেয়ে অনেক ভালো।

“বেরাঙ আর্ট অরগানাইজেশন ” এর সাথে আপনার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে আমাদের বলুন।  

– “বেরাঙ ” অর্থ রঙহীন।  একটা গল্প আছে এটা নিয়ে।  আমি ২০০৯-এ কাবুলের সেরা ১০ শিল্পীর মধ্যে একজন নির্বাচিত হই।  তারপর এই দশজন শিল্পী মিলে নতুন সংগঠন শুরু করি যাতে সমসাময়িক শিল্প নিয়ে কাজ করতে পারি।  প্রথমে একে আমরা “রস্ত্ব” নাম দিয়েছিলাম,  এখন একে আমরা “বেরাঙ ” নামে ডাকি। এখান থেকে আমরা বিভিন্ন সেমিনার-ওয়ার্কশপ আয়োজন করি। এখনো আমাদের অর্থনৈতিক সামর্থ তেমন ভালো না। চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আমাদের ইচ্ছা সবার কাজের সুযোগ করে দেওয়া। তাদের কাজ করার একটা জায়গা করে দেওয়া। একটা লাইব্রেরি গড়ে তোলা। আরো অনেক প্ল্যান আছে। চেষ্টা করে যাচ্ছি একটু একটু করে।

আপনার কি মনে হয় আফগানিস্তানের মানুষ ইন্টারনেটের সাহায্যে সমসাময়িক আর্ট সম্পর্কে জানছে?

– আমি আসলে ঠিক জানি না। হয়তো তারা ইন্টারনেট দ্বারা অনুপ্রাণিত অথবা শিল্প তৈরি বা শিল্প নিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। আমি মনে করি, যখন মানুষ বুঝতে পারছে যে আর্ট শুধু আর্ট না, একটা মেসেজও দেয়, তখন আর্টকে তারা আরো বড় করে দেখে। তখন তারা ভাবে যে এটা শুধু ড্রয়িং বা শুধু শিল্প না।  এর বলারও কিছু আছে। সবাই ছবির মাধ্যমে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পছন্দ করে।  আধুনিক শিল্প শুধুই ছবি না।  এর বলার অনেক কিছু থাকে।

আফগানিস্তানের পরিস্থিতি ভিন্ন।  কারণ এখানে সবারই মতামত রাজনীতি সম্পর্কিত।  সবাই যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।  তারা একটা ছবি দেখে,  ছবি নিয়ে কথা বলতে থাকে।  এখানে নতুন কিছু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যেমন : শান্তি,  যুদ্ধবিরতি।  এরকম আশাবাদী চিন্তা মানুষ উন্নত করতে চায়।

শিল্পীরা কি তাদের শিল্পকে রাজনৈতিক ভাবপ্রকাশের পন্থা হিসেবে বেছে নিয়েছে? 

– হ্যাঁ,  শুধু রাজনৈতিক নয়, অন্যান্য সমস্যার বিরুদ্ধেও শিল্পকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন: শিক্ষা।  সবাই চায় রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে, তাদের চিন্তাধারা দিয়ে তা জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে।  শিল্পীরাও তাদের শিল্পকে উন্নত করার চেষ্টা করছে এবং তারা আশাবাদী যে, শিল্পের উন্নতির মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবে।

নারী অধিকারকে জনসম্মুখে তুলে ধরার জন্য আপনি স্ট্রিট আর্টকে কিভাবে ব্যবহার করেন? 

– এই বিষয়ে আমি কথা বলতে পছন্দ করি।  আমি দেখেছি বিভিন্ন সময়ে এবং তালেবান যুদ্ধ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে মানুষ প্রচুর সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। নারীরা প্রচুর সীমাবদ্ধতার স্বীকার হয়েছে এই সময়।  অতীতে,  নারীদের সমাজ থেকে বঞ্চিত করে রাখা হতো এবং তারা চাইতো নারী শুধুই ঘরে থাকুক।  এখন আমি চাই মানুষকে নারীদের কথা মনে করিয়ে দিতে।

আমি আমার ছবিতে পরিবর্তন এনেছি নারীদের শক্তি,  সামর্থ তাদের আনন্দ দেখানোর জন্য।  আমার ছবিতে,  সেখানে প্রচুর মুভমেন্ট লক্ষ্য করা যায়।  আমি দেখাতে চাই যে, নারীরা আফগান সমাজে ফিরে এসেছে নতুন ও শক্তিশালী অবয়ব নিয়ে।  ইনি সেই একই নারী না- যে সারাদিন ঘরে থাকতো।  ইনি নতুন।  এই নারী শক্তিতে,  উদ্দ্যমে নতুন করে শুরু করতে চায়।  আপনি দেখতে পাবেন যে আমার ছবিতে আমি মেয়েদের জীবনের চেয়ে বড় করে একেঁছি।  আমি বলতে চাই যে মানুষ এখন তাদের নতুন করে দেখছে, সেই পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নয়।

পশ্চিমা মিডিয়ায় অধিকাংশে “বোরকা”কে  জেলখানা বলা হয়েছে।  বোরকা’র প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? 

– পুরো পৃথিবীর একটা বড় অংশ মনে করে বোরকাই প্রধান সমস্যা।  তারা মনে করে যে,  মেয়েরা বোরকা পড়া ছেড়ে দিলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।  কিন্তু এটা সত্য না।  আমি অনুভব করি যে,  আফগানিস্তানের মেয়েদের প্রচুর সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।  যেমন,  নারীদের শিক্ষার অনুমতি নেই।  এটা বোরকার চেয়ে বড় সমস্যা।  এখন আমাকে বলুন বোরকা খুলে ফেললেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?  বোরকা প্রধান সমস্যা নয়। এ নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথার প্রয়োজন নেই।  আমরা যদি আমাদের সমস্যাগুলোর দিকে তাকাই, তবে বোরকা খুব খারাপ না ! আপনি প্রতিভা বিকাশ করতে করতেও বোরকা পরতে পারেন।  আপনি কাজ করতে করতে,  সমাজে থেকে,  বসবাস করতে করতেও বোরকা পরতে পারেন।

আপনার অধিকাংশ ছবিতেই নীল রঙের প্রচুর ব্যবহার দেখা যায়। এটা কেনো? 

– নীল আমার প্রিয় রঙ।  আমার খুবই ভালো লাগে।  খুব বেশিই ভালো লাগে। আমি রঙিন কাজ করে আনন্দ পাই; আবার মানুষকে বলতে শুনি মুক্তির আরেক রঙ নীল।  আমার মতে, বোরকা খুলে ফেলাই মুক্তি না।  মুক্তি হচ্ছে মনের শান্তি।

আফগানিস্তানে সমসাময়িক শিল্প কী গুরুত্বপূর্ণ? কেনো? 

– হ্যাঁ, গুরুত্বপূর্ণ।  মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে কথা শুনতে শুনতে ।  তাদের যদি ছবি দেখান, ছবির প্রভাব বেশি পড়ে।  আপনি জানেন যে,  শব্দ একটি শব্দ মাত্র।  কিন্তু ছবি, একটা ছবি হচ্ছে অনেকগুলো শব্দ।  ছবি আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বসূলভ সম্পর্ক গড়ে তোলে। আমরা ছবির মাধ্যমে অনেক সংবেদনশীল বিষয় আলোচনা করতে পারি।  আমরা চাইলেই বাস্তবসম্মত পরির্বতন আনতে পারি। আমরা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরির্বতন করতে পারি শিল্প দিয়ে।

আফগানিস্তান একটি নবজাতক শিশু।  সদ্যজাত শিশু যে নিজে নিজেই হাঁটতে শিখছে।  অন্য দেশ একে সাহায্য করছে নিজ পায়ে দাঁড়াতে।

আপনাদের কী কোন প্ল্যান আছে অন্য দেশ থেকে শিল্পীদের নিয়ে আসার? 

– এখনো না।  আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা নেই এখন।  কয়েকটি প্রজেক্ট নিয়ে আমরা এই মুহূর্তে কাজ করছি। অনেক প্ল্যান আছে আমাদের।

আর্ন্তজাতিক পরিচিতি এবং সুযোগ আফগান শিল্পীদের জন্য কতটুকু দরকার?  কিভাবে তাদের আরো সহযোগিতা করা যায়? 

– হ্যাঁ।  তাদের জন্য আর্ন্তজাতিক প্রোগ্রাম খুব দরকার।  একজন শিল্পী হিসেবে, আমি আমার চিন্তা চেতনা আফগানিস্তানের বাইরেও প্রকাশ করতে চাই,  কয়েকজন এই সুবিধাটা পায়,  কিন্তু সবাই না।  আমি ভ্রমণ পছন্দ করি।  কিন্তু শিল্পীদের উদ্দেশ্য আলাদা থাকে (আফগানিস্তানের বাইরে যাবার) ।  আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে বাইরের মানুষের আফগানিস্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরির্বতন  করতে চাই।  আফগানিস্তান যুদ্ধের জন্য বিখ্যাত।  যদি বাইরের মানুষ আফগানিস্তানের শিল্প ও শিল্পী দেখে, তাহলে ধীরে ধীরে আফগানিস্তান নিয়ে  কথা বলতে গেলে আফগানিস্তানের শিল্প নিয়েও বলবে,  যুদ্ধ না শুধু।

এখানে যুদ্ধ আছে। কিন্তু শিল্প তো তারচেয়েও পুরনো।  আমরা চাই শিল্পকে যুদ্ধের চেয়েও শক্তিশালী করে তুলতে।

সামনে আপনার কোন আর্ন্তজাতিক প্রর্দশনী বা প্রকল্প রয়েছে?

– আপনি মনে হয় জানেন, আমি কয়েকদিন আগেই সুইজারল্যান্ড থেকে ফিরে এসেছি।  ২০১৩ সালে আমার ডেনমার্ক যাবার সুযোগ এসেছিলো একটা প্রোগ্রামে “ওর্য়াল্ড ইমেজেস ইন মোশন ” (world images in motion) ।  এরপর আমি আমেরিকা গিয়েছিলাম কয়েকটি আমন্ত্রণে । বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিতে কিছু সমস্যা হয়।  আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।

আপনার কী কোন প্ল্যান আছে,  আফগান স্ট্রিট আর্টিস্টদের সাথে অন্য দেশের শিল্পীদের একসাথে আনার? 

– ব্যাঙ্কসির সাথে যোগযোগ করতে চাই।  আমি তার কিছু কাজ আমার ” ড্রিমিং গ্রাফিতি “তে ব্যবহার করেছি। তার কাজ ব্যবহার করে একটি সিরিজ তৈরি করেছি। তার সাথে যোগাযোগ করতে চাই এবং একসাথে কাজ করতে চাই

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this:
আর্ট যুদ্ধের চেয়েও শক্তিশালী — শামসিয়া হাসানি | ভাষান্তর : তন্ময় হাসান | শিরিষের ডালপালা । সাহিত্য ওয়েবজিন

আর্ট যুদ্ধের চেয়েও শক্তিশালী — শামসিয়া হাসানি | ভাষান্তর : তন্ময় হাসান

শামসিয়া হাসানি। জন্ম ১৯৮৮-তে।  আফগানিস্তানের কাবুলের প্রথম নারী গ্রাফিতি শিল্পী। তিনি আফগানিস্তানের যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভাঙা দেয়াল বেছে নেন আঁকার ক্যানভাস হিসাবে। তার গ্রাফিতির বিষয় মূলত আফগানিস্তানের নারীরা। তাদের যে সংগ্রাম-সাহস তা নানানভাবে তিনি তুলে আনেন। আমাদের গ্রাফিতি সংখ্যার বিষয় হিসেবে আমরা আফগানিস্তানের গ্রাফিতিকে তুলে আনতে চেয়েছি শামসিয়া’র এ সাক্ষাৎকারটির মাধ্যমে। তার এ সাক্ষাৎকার নেয়া হয়  Art Radar পত্রিকা থেকে, ২০১৩ তে। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন তন্ময় হাসান।


 

আপনি কীভাবে আফগানিস্তানে স্ট্রিট আর্ট শুরু করেন?

– আমি প্রথমে শুরু করি ২০১০ এর ডিসেম্বরে,  কাবুলে ‘চু ‘ নামে একজন গ্রাফিতি শিল্পী আসেন ইংল্যান্ড থেকে আমাদের শেখাতে। ওর্য়াকশপটি অর্গানাইজ করেছিলো “কমব্যাট কমুনিকেশন”

আপনার দেশের একজন অগ্রদূত হিসেবে, কী বা কে আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে?

– গ্রাফিতি ওর্য়াকশপের পর আমার মনে হয়েছে, গ্রাফিতির মাধ্যমে আর্টকে মানুষের কাছে নিয়ে আসা  সম্ভব , কারণ গ্রাফিতি সবসময় খোলা জায়গাতে হয়। এমনিতে  আর্ট এক্সিবিশনে তো আমরা সবাইকে আমন্ত্রণ জানাতে পারি না, সবাই আসেও না। তাই কোন এক্সিবিশন  যদি খোলা জায়গায় হয়, সবার জন্য সেটা উপভোগ্য।  আমি চাই যুদ্ধের সব স্মৃতির ওপর রঙ করে যেতে, তাহলেই  আমি মানুষেরর মাথা থেকে যুদ্ধের ভয়ংকর স্মৃতি মুছে দিতে পারব। আমি চাই মানুষ আফগানিস্তানকে তার শিল্পের জন্য মনে রাখুক, যুদ্ধের জন্য নয়।

আপনার মতে স্ট্রিট আর্ট কিভাবে অন্য সমসাময়িক শিল্পের চেয়ে আলাদা? এটা কী বেশি গুরুত্বপূর্ণ?নাকি কম? কেনো?

– আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে, গ্রাফিতি ব্যতিক্রম। যেখানে,  ইউরোপ বা অন্য দেশে গ্রাফিতি বেআইনি।  আফগানিস্তানে,  আমি এটাকে বিভিন্ন বার্তা, আইডিয়া প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করি। সব রকমের শিল্পই এখানে (আফগানিস্তানে) দরকার। তবে গ্রাফিতি যেহেতু  উন্মুক্ত, এটার ইমপ্যাক্ট ব্যতিক্রম, ভালো, মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানো যায়।  এটা আমার মনে হয়।

আপনার পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন আপনার শিল্পের প্রতি? 

– আমার পরিবার এটা পছন্দ করে।  তারা সবসময় আমাকে সাহায্য করে।  তারা কখনো আমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করে না।  তারা পছন্দ করে,  এ নিয়ে আমি খুশি।

আপনার পরিবার কী আফগানিস্তানে?  আপনার জন্মস্থান কোথায়? 

– আমার পরিবার আফগানিস্তানে। আমার জন্ম ইরানে।  ইরান অন্য অনেক দেশ থেকে আলাদা।  ধরুন আপনি ১০০ বছর ধরে ইরানে বসবাস করছেন, তবুও আপনি সেখানের (ইরানের) নাগরিকত্ব পাবেন না।  ইরানে থাকাকালীন আমি চারুকলা নিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারি নি, জাতীয়তার কারণে।  আমরা আফগানিস্তান ফিরে আসি আট বছর আগে।  মূলত আমার পরিবার কান্দাহারে।

কাবুলের রাস্তায় গ্রাফিতি আঁকার সমস্যাগুলো কেমন? 

– এটা ইউরোপ থেকে আলাদা,  সেখানে সবাইকে পুলিশ থেকে সাবধান থাকতে হয়। কাবুলে, আমার পুলিশের সাথে কোন সমস্যা হয় না।  আমার সমস্যা নিচু মানসিকতার মানুষ নিয়ে এবং আমার বড় সমস্যা হচ্ছে নিরাপত্তা।  বিশেষত যখন রাস্তায় থাকি, মনে হয়  এই বুঝি কিছু হয়,  মনে হয় আসা উচিত হয় নি।

স্ট্রিট আর্ট করতে গিয়ে বিস্ময়কর  কী কী খুঁজে পেয়েছেন?

– প্রথমে যখন আমি গ্রাফিতি করবো ঠিক করি,  আমি সরাসরি  বড়,  খোলা জায়গায় শুরু করি নি।  যদি আমি কোন অভ্যন্তরীণ কোন জায়গায় বা কোন কর্নারে করতাম,  তাহলে আমার জন্য সুবিধা হতো ।  এখন আমি সব জায়গায় করে থাকি। আমার কোন ধারণা ছিলো না কী কী সমস্যা হতে পারে।  কারণ, গ্রাফিতি একদম নতুন,  মানুষের ভিন্ন মত থাকবেই।  আমি মানসিকভাবে গালিগালাজ শুনতেও প্রস্তুত ছিলাম,  যারা আর্ট দেখতে পারে না তাদের কাছে।  কিছু মানুষ তাদের আবেগ নিয়ে কথা বলতে আসে,  কিছু মানুষ আমার সাথে আসে সহযোদ্ধা হিসেবে। আবার কিছু মানুষ চায় আমার গ্রাফিতি বন্ধ করতে।

বিস্মিত সবচেয়ে বেশি হয়েছিলাম যখন শুনেছিলাম কেউ বলছে, ” দেয়ালগুলো নোংরা করছো কেনো? ” কিছু মানুষ এটাও চিন্তা করতো যে আমি যা করছি তা ইসলামে অনুমিত কি না।  অন্যরা মনে করে মেয়েদের এসব করা ভালো না ।  খোলা রাস্তায় তো মোটেই না।  আবার একই সময় অল্প হলেও কিছু মানুষ আমার ছবি আঁকা খুব পছন্দ করে।

একজন মেয়ে হিসেবে আফগানিস্তানে যখন গ্রাফিতি করেন,  কী ধরনের প্রতিক্রিয়া পান?  আপনি কি হুমকির মুখে থাকেন বা ভীত থাকেন? বা প্রশংসা পেয়েছেন? 

– নানা ধরনের মানুষ নানান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখে আমার কাজ।  কিছু মানুষ জানার খুব আগ্রহ দেখায়,  যে এটা কি?  এটা খুব ভালো লাগে।  কেউ কেউ আছে যারা পছন্দ করে, কিন্তু বুঝে না বিষয়টা। আরেক শ্রেণির লোক আছে, বলে ”এসব তো হারাম”,  “দেয়াল নোংরা করতেছো কেনো? ” এরা ভাবে আমি প্রচণ্ড স্বাধীন,  আমার খেয়ে-দেয়ে কোন কাজ নাই , তাই দেয়াল নোংরা করে বেড়াই।  অনেকে অনেকভাবে দেখে।

“ড্রিমিং গ্রাফিতি ” সম্পর্কে কিছু বলুন এবং এই টেকনিক ব্যবহার করার আইডিয়াটা কীভাবে পান? 

– আমি সবসময় ভালো সুযোগ পাই নি বাইরে গ্রাফিতি করার।  দুই তিন মাসে একটি সুযোগ পাই । কখনো নিরাপত্তার অভাবে যেতে পারি না। কখনো সেখানের মানুষের জন্য।

আমি সিদ্ধান্ত নিই ডিজিটাল ইমেজ ব্যবহার করার এবং তারপর আমার স্টুডিওতে গ্রাফিতি করতে পারবো।  আমি ছবিগুলোর উপর ব্রাশ করে গ্রাফিতি করতে পারবো এবং রঙ ব্যবহার করতে পারবো।  তাই এটা আমার কাছে অনেকটা ” স্বপ্নের গ্রাফিতি “। এটা শুধু আমার মনে মনে,  বাস্তব নয়।

আপনি কিংবা অন্য কেউ কি তরুণ আফগান শিল্পীদের মেন্টরিং করছেন? 

– হ্যাঁ,  আমি ওদের গ্রাফিতি করা শেখাতে চাই। এটাতো কোন ফরমাল ক্লাস না যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিতে পারবো। তাই আমরা যদি ওয়ার্কশপ  অ্যারেঞ্জ করি, অইখানেই গ্রাফিতি শেখাতে পারবো। তখন  তারা নিজেদের মতন করে গ্রাফিতি করতে পারবে।  তরুণরা এটা খুব পছন্দ করে।  কারণ এটা সম্পূর্ণ নতুন ধারার শিল্প। এটি কাগজের ড্রয়িং থেকে  আলাদা এবং  যত বড় ইচ্ছা করা যায়।

আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, অইখানে আমি সবচে ইয়ং এবং ওয়ার্কশপের অধিকাংশ শির্ক্ষাথীই আমার বয়সী। ওদের বয়স ধরেন ২০ থেকে ২৬ এমন।

আফগানিস্তানে  শিল্প বা ইতিহাসের উপর  আগ্রহ কেমন? 

– এখানে মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ের একটা ট্রাডিশন আছে। শুরু করেছিলেন কামালউদ্দীন বেহজাদ । তিনিই  আফগানিস্তানে প্রথম মিনিয়েচার আর্টিস্ট। উনার জন্ম হেরাতে।  উনি লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির সমসাময়িক।  লিওনার্দো যখন ইউরোপে ছবি আঁকছিলেন, কামালউদ্দীন তখন  ছবি আঁকছিলেন আফগানিস্তানে।

আফগানিস্তানে কি ভিজুয়াল আর্ট পড়ানো হয়?  

– হ্যাঁ, পড়ানো হয়।  কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মান্ধাতার আমলের শিক্ষাব্যবস্থার কারণে কিছু সমস্যা আছে।  বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ক্ল্যাসিকাল কিছু জিনিস শেখানো হয়। আস্তে আস্তে কনটেম্পরারি আর্টসহ নানান বিষয় আসবে।

আমি নিজেও তো কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার একজন শিক্ষক।  শিক্ষার্থীরা যখন জানতে পারলো আমি গ্রাফিতি করছি, তারা শেখার আগ্রহ দেখালো।  গতবছর আমি একটি ওয়ার্কশপ  করেছি তাদের জন্য।  প্রতি বছর আমি এই গ্রাফিতি ওয়ার্কশপ চালিয়ে যেতে চাই কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আর গ্রাফিতি শেখাতে পারবো না। আফগানিস্তানে এখন প্রচুর নতুন শিল্পী রয়েছে।  ৮ বছর আগে আমি যখন আফগানিস্তানে আসি, তখন কোন ভালো শিল্প বা শিল্পী দেখতে পাই নাই। এখন সবকিছু উন্নত হচ্ছে এবং এখন আফগান শিল্প আগের চেয়ে অনেক ভালো।

“বেরাঙ আর্ট অরগানাইজেশন ” এর সাথে আপনার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে আমাদের বলুন।  

– “বেরাঙ ” অর্থ রঙহীন।  একটা গল্প আছে এটা নিয়ে।  আমি ২০০৯-এ কাবুলের সেরা ১০ শিল্পীর মধ্যে একজন নির্বাচিত হই।  তারপর এই দশজন শিল্পী মিলে নতুন সংগঠন শুরু করি যাতে সমসাময়িক শিল্প নিয়ে কাজ করতে পারি।  প্রথমে একে আমরা “রস্ত্ব” নাম দিয়েছিলাম,  এখন একে আমরা “বেরাঙ ” নামে ডাকি। এখান থেকে আমরা বিভিন্ন সেমিনার-ওয়ার্কশপ আয়োজন করি। এখনো আমাদের অর্থনৈতিক সামর্থ তেমন ভালো না। চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আমাদের ইচ্ছা সবার কাজের সুযোগ করে দেওয়া। তাদের কাজ করার একটা জায়গা করে দেওয়া। একটা লাইব্রেরি গড়ে তোলা। আরো অনেক প্ল্যান আছে। চেষ্টা করে যাচ্ছি একটু একটু করে।

আপনার কি মনে হয় আফগানিস্তানের মানুষ ইন্টারনেটের সাহায্যে সমসাময়িক আর্ট সম্পর্কে জানছে?

– আমি আসলে ঠিক জানি না। হয়তো তারা ইন্টারনেট দ্বারা অনুপ্রাণিত অথবা শিল্প তৈরি বা শিল্প নিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। আমি মনে করি, যখন মানুষ বুঝতে পারছে যে আর্ট শুধু আর্ট না, একটা মেসেজও দেয়, তখন আর্টকে তারা আরো বড় করে দেখে। তখন তারা ভাবে যে এটা শুধু ড্রয়িং বা শুধু শিল্প না।  এর বলারও কিছু আছে। সবাই ছবির মাধ্যমে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পছন্দ করে।  আধুনিক শিল্প শুধুই ছবি না।  এর বলার অনেক কিছু থাকে।

আফগানিস্তানের পরিস্থিতি ভিন্ন।  কারণ এখানে সবারই মতামত রাজনীতি সম্পর্কিত।  সবাই যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।  তারা একটা ছবি দেখে,  ছবি নিয়ে কথা বলতে থাকে।  এখানে নতুন কিছু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যেমন : শান্তি,  যুদ্ধবিরতি।  এরকম আশাবাদী চিন্তা মানুষ উন্নত করতে চায়।

শিল্পীরা কি তাদের শিল্পকে রাজনৈতিক ভাবপ্রকাশের পন্থা হিসেবে বেছে নিয়েছে? 

– হ্যাঁ,  শুধু রাজনৈতিক নয়, অন্যান্য সমস্যার বিরুদ্ধেও শিল্পকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন: শিক্ষা।  সবাই চায় রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে, তাদের চিন্তাধারা দিয়ে তা জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে।  শিল্পীরাও তাদের শিল্পকে উন্নত করার চেষ্টা করছে এবং তারা আশাবাদী যে, শিল্পের উন্নতির মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবে।

নারী অধিকারকে জনসম্মুখে তুলে ধরার জন্য আপনি স্ট্রিট আর্টকে কিভাবে ব্যবহার করেন? 

– এই বিষয়ে আমি কথা বলতে পছন্দ করি।  আমি দেখেছি বিভিন্ন সময়ে এবং তালেবান যুদ্ধ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে মানুষ প্রচুর সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। নারীরা প্রচুর সীমাবদ্ধতার স্বীকার হয়েছে এই সময়।  অতীতে,  নারীদের সমাজ থেকে বঞ্চিত করে রাখা হতো এবং তারা চাইতো নারী শুধুই ঘরে থাকুক।  এখন আমি চাই মানুষকে নারীদের কথা মনে করিয়ে দিতে।

আমি আমার ছবিতে পরিবর্তন এনেছি নারীদের শক্তি,  সামর্থ তাদের আনন্দ দেখানোর জন্য।  আমার ছবিতে,  সেখানে প্রচুর মুভমেন্ট লক্ষ্য করা যায়।  আমি দেখাতে চাই যে, নারীরা আফগান সমাজে ফিরে এসেছে নতুন ও শক্তিশালী অবয়ব নিয়ে।  ইনি সেই একই নারী না- যে সারাদিন ঘরে থাকতো।  ইনি নতুন।  এই নারী শক্তিতে,  উদ্দ্যমে নতুন করে শুরু করতে চায়।  আপনি দেখতে পাবেন যে আমার ছবিতে আমি মেয়েদের জীবনের চেয়ে বড় করে একেঁছি।  আমি বলতে চাই যে মানুষ এখন তাদের নতুন করে দেখছে, সেই পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নয়।

পশ্চিমা মিডিয়ায় অধিকাংশে “বোরকা”কে  জেলখানা বলা হয়েছে।  বোরকা’র প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? 

– পুরো পৃথিবীর একটা বড় অংশ মনে করে বোরকাই প্রধান সমস্যা।  তারা মনে করে যে,  মেয়েরা বোরকা পড়া ছেড়ে দিলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।  কিন্তু এটা সত্য না।  আমি অনুভব করি যে,  আফগানিস্তানের মেয়েদের প্রচুর সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।  যেমন,  নারীদের শিক্ষার অনুমতি নেই।  এটা বোরকার চেয়ে বড় সমস্যা।  এখন আমাকে বলুন বোরকা খুলে ফেললেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?  বোরকা প্রধান সমস্যা নয়। এ নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথার প্রয়োজন নেই।  আমরা যদি আমাদের সমস্যাগুলোর দিকে তাকাই, তবে বোরকা খুব খারাপ না ! আপনি প্রতিভা বিকাশ করতে করতেও বোরকা পরতে পারেন।  আপনি কাজ করতে করতে,  সমাজে থেকে,  বসবাস করতে করতেও বোরকা পরতে পারেন।

আপনার অধিকাংশ ছবিতেই নীল রঙের প্রচুর ব্যবহার দেখা যায়। এটা কেনো? 

– নীল আমার প্রিয় রঙ।  আমার খুবই ভালো লাগে।  খুব বেশিই ভালো লাগে। আমি রঙিন কাজ করে আনন্দ পাই; আবার মানুষকে বলতে শুনি মুক্তির আরেক রঙ নীল।  আমার মতে, বোরকা খুলে ফেলাই মুক্তি না।  মুক্তি হচ্ছে মনের শান্তি।

আফগানিস্তানে সমসাময়িক শিল্প কী গুরুত্বপূর্ণ? কেনো? 

– হ্যাঁ, গুরুত্বপূর্ণ।  মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে কথা শুনতে শুনতে ।  তাদের যদি ছবি দেখান, ছবির প্রভাব বেশি পড়ে।  আপনি জানেন যে,  শব্দ একটি শব্দ মাত্র।  কিন্তু ছবি, একটা ছবি হচ্ছে অনেকগুলো শব্দ।  ছবি আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বসূলভ সম্পর্ক গড়ে তোলে। আমরা ছবির মাধ্যমে অনেক সংবেদনশীল বিষয় আলোচনা করতে পারি।  আমরা চাইলেই বাস্তবসম্মত পরির্বতন আনতে পারি। আমরা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরির্বতন করতে পারি শিল্প দিয়ে।

আফগানিস্তান একটি নবজাতক শিশু।  সদ্যজাত শিশু যে নিজে নিজেই হাঁটতে শিখছে।  অন্য দেশ একে সাহায্য করছে নিজ পায়ে দাঁড়াতে।

আপনাদের কী কোন প্ল্যান আছে অন্য দেশ থেকে শিল্পীদের নিয়ে আসার? 

– এখনো না।  আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা নেই এখন।  কয়েকটি প্রজেক্ট নিয়ে আমরা এই মুহূর্তে কাজ করছি। অনেক প্ল্যান আছে আমাদের।

আর্ন্তজাতিক পরিচিতি এবং সুযোগ আফগান শিল্পীদের জন্য কতটুকু দরকার?  কিভাবে তাদের আরো সহযোগিতা করা যায়? 

– হ্যাঁ।  তাদের জন্য আর্ন্তজাতিক প্রোগ্রাম খুব দরকার।  একজন শিল্পী হিসেবে, আমি আমার চিন্তা চেতনা আফগানিস্তানের বাইরেও প্রকাশ করতে চাই,  কয়েকজন এই সুবিধাটা পায়,  কিন্তু সবাই না।  আমি ভ্রমণ পছন্দ করি।  কিন্তু শিল্পীদের উদ্দেশ্য আলাদা থাকে (আফগানিস্তানের বাইরে যাবার) ।  আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে বাইরের মানুষের আফগানিস্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরির্বতন  করতে চাই।  আফগানিস্তান যুদ্ধের জন্য বিখ্যাত।  যদি বাইরের মানুষ আফগানিস্তানের শিল্প ও শিল্পী দেখে, তাহলে ধীরে ধীরে আফগানিস্তান নিয়ে  কথা বলতে গেলে আফগানিস্তানের শিল্প নিয়েও বলবে,  যুদ্ধ না শুধু।

এখানে যুদ্ধ আছে। কিন্তু শিল্প তো তারচেয়েও পুরনো।  আমরা চাই শিল্পকে যুদ্ধের চেয়েও শক্তিশালী করে তুলতে।

সামনে আপনার কোন আর্ন্তজাতিক প্রর্দশনী বা প্রকল্প রয়েছে?

– আপনি মনে হয় জানেন, আমি কয়েকদিন আগেই সুইজারল্যান্ড থেকে ফিরে এসেছি।  ২০১৩ সালে আমার ডেনমার্ক যাবার সুযোগ এসেছিলো একটা প্রোগ্রামে “ওর্য়াল্ড ইমেজেস ইন মোশন ” (world images in motion) ।  এরপর আমি আমেরিকা গিয়েছিলাম কয়েকটি আমন্ত্রণে । বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিতে কিছু সমস্যা হয়।  আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।

আপনার কী কোন প্ল্যান আছে,  আফগান স্ট্রিট আর্টিস্টদের সাথে অন্য দেশের শিল্পীদের একসাথে আনার? 

– ব্যাঙ্কসির সাথে যোগযোগ করতে চাই।  আমি তার কিছু কাজ আমার ” ড্রিমিং গ্রাফিতি “তে ব্যবহার করেছি। তার কাজ ব্যবহার করে একটি সিরিজ তৈরি করেছি। তার সাথে যোগাযোগ করতে চাই এবং একসাথে কাজ করতে চাই

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: