home আলাপচারিতা আমি নিজের বিনিময়ে কবিতাকে চাই – শাহ মাইদুল ইসলাম ।। মাইদুলের সঙ্গে পাঁচ কবির আলাপচারিতা

আমি নিজের বিনিময়ে কবিতাকে চাই – শাহ মাইদুল ইসলাম ।। মাইদুলের সঙ্গে পাঁচ কবির আলাপচারিতা

দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিদের সঙ্গে আড্ডার তৃতীয় পর্যায়ে আড্ডা জমেছিল শাহ মাইদুল ইসলামের সঙ্গে। ‘ঘোড়া ও প্রাচীর বিষয়ক’ মাইদুলের একমাত্র প্রকাশিত বই, যে বইয়ের কবিতা মাইদুলকে স্বতন্ত্র ভাষার কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। অনেকটাই নিভৃতচারী এই কবি থাকেন হবিগঞ্জে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও খুব একটা হুল্লোড় নেই তার। নিজের কবিতাই মাইদুলের শক্তি এবং সেই শক্তির উপর তার প্রবল আস্থা। মাইদুলের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন আরো পাঁচ কবি – শামশাম তাজিল, শারমিন রাহমান, মোস্তফা হামেদী, হাসান রোবায়েত ও রুহুল মাহফুজ জয়।


কবিও তো মানুষের মতোই ভাবে, আর দেশকালে অপরাপর মানুষদের মতোই তার যাপিত জীবন। সুতরাং যখন কোন পংক্তি আমাকে নাড়া দেয়, আমি ধরেই নিতে পারি সেটা অপরকেও নাড়া দেবে। এবং এই বিষয়টায় আমি অত্যন্ত আস্থাবান।


শামশাম তাজিল

মাইদুল, প্রথমেই জানতে চাইবো, কবিতা আপনি কেন লেখেন?

শাহ মাইদুল ইসলাম

কারণ কবিতা লেখাটা আমি জানি। আর জানি বহু এমন কথা আমি কবিতায় বলি যা অন্য উপায়ে বলবার ক্ষমতা আমার নাই। সুতরাং বলা যায় কবিতা না লিখে আমার কোন উপায় নাই। আমি বোবা হতে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক, শামশাম ভাই।

শামশাম

যেহেতু বোবা শব্দটা ব্যবহার করলেনই, বলতে চাই, কবি ছাড়া অন্যরা কি তবে বোবা? কবিতার ভেতর এই ব্যক্ত হবার ক্ষমতাই কী আপনাকে কবিতা লেখতে অনুপ্রাণিত করেছে? অথবা, এই অনুপ্রেরণা শব্দ ব্যতিরেকেই বলুন।

মাইদুল

‘বোবাশব্দ’ বলে একটা শব্দ আমি প্রায়ই ব্যবহার করে থাকি। অর্থাৎ ‘বোবাশব্দ’ বলেও শব্দ আছে, যেটা শুধু নৈঃশব্দ্যকেই বোঝায় না, বরং নৈঃশব্দের শব্দকে বোঝায়। এই অর্থে কেউই প্রকৃতপক্ষে বোবা নয়। সকলেরই নিজের, নিজের শব্দ-শব্দভান্ডার আছে। আর আমি মাইদুলের ক্ষেত্রে এটা কবিতায় থাকা না-থাকার সাথে সম্পর্কিত। অর্থ্যাৎ আমি কবিতায় শব্দময় হয়ে উঠি, উঠতে চাই। কবিতায় না-থাকাটাকে আমি নিঃশব্দ থাকা মনে করি।

শারমিন রাহমান

একটা বিষয় হল দেখানো, আরেকটা হল পারফর্মেন্স। কবিতার ক্ষেত্রে মাইদুলের কবিতা আমার কাছে পারফর্মিং আর্টের মত মনে হয়। মাইদুল, তুমি কি বলো?

মাইদুল

দুটোই পরস্পর ঘনিষ্ট বিষয়। যখন আমি কিছু একটা করছি, তখন সেটা দ্রষ্টব্য হয়ে উঠছেই। আমার ক্ষেত্রে কবিতাটা যাপনের একটা অংশ, কবিতা ও অপরাপর সবকিছু নিয়ে আমি জীবন যাপন করছি এবং চাইও। সুতরাং যাপনের সারাৎসারকে কবিতা করে তুলবার স্পৃহা আমার মধ্যে দুর্বার। আর তাই, শারমিন রাহমান আপনার এই দেখার সাথে আমি একমত।

শারমিন

হুম। বুলবুল চৌধুরীরর গল্প শুনতাম, তিনি নাকি হরিণ শিকার করতে যাইতেন, শিকারের কিছু ব্যবস্থাপনা আছে, একদিক থেকে একদলের তাড়িয়ে আনা, আর অন্যদিকে ওত পেতে থাকা শিকারীর তাকে বধ করার মত। উনি নাকি ওই বিভ্রান্ত হরিণের দিকে তাকায়ে থাকতেন, পরে ওইটা তার নাচে নিয়ে আসতেন। যাই হোক, তুমি একটা কবিতা অনেকবার অনেক ভাবে এডিট কর দেখি, তারপরেও সাব্জেক্ট-ম্যাটার অপরিবর্তিত থাকে। তুমি কি বিষয় নির্দিষ্ট করেই লিখ?

শাহ মাইদুল

খুব সম্ভবত, তাই। আমি কী বলতে চাই, তা আমার কাছে পষ্ট হলেই আমি তা লিখবার চেষ্টা করতে থাকি। সেটা এমনকি খুব বিশ্রীভাবেও শুরু হয়। তারপর থেকে লেখাটাকে নিয়ে আমি নানাভাবে ভাবি, আর হ্যাঁ বিষয়টা কিন্তু অপরিবর্তিতই থাকে। এইটা অনেকদিন পর্যন্ত চলতে থাকে। এমনকি আমার বইয়ে প্রকাশিত লেখাগুলোও আমি নতুন লেখার মতই মনে মনে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করি। এইটা আমার একটা অসুখ-ই বলা যায়।

শারমিন

আম ফুলের ছায়ার মতো মৃত সব মাছেরা চোখ মটকে আছে – এই ধরণের অসংখ্য উপমা আসে তোমার লেখায়, খুব স্পষ্ট – পুরানো নতুন সব সময়কেই হুট করে বেঁধে ফেলে কোন ইউনিফর্মিটি ছাড়াই- এটা কিভাবে?

মাইদুল

পংক্তিটা বোধহয় “আম ফুলের ছায়ায় মৃত সব মাছেরা চোখ মটকে আছে।”

মানুষের জ্ঞানার্জনের পদ্ধতিটাই এরকম, মানুষ একটা জিনিসকে যখন অপর কারো কাছে ভাষিক পদ্ধতিতে উপস্থাপন করতে চায়, তখন যে সমরূপ একটা জিনিসের সাথে সাদৃশ্যমূলক উপায়ে তাকে বর্ণনা করে থাকে। অর্থাৎ অমুক জিনিসটা তমুক জিনিসের মতো। কবিরা এটা অনেক ভাবনা-চিন্তার মাধ্যমে করে থাকেন। সেটি যাতে সুন্দর ও সুশ্রী হয় সেদিকে কবির মনোযোগ থাকে। আর এটা চেতন-অচেতন উভয় উপায়েই কবিরা করে থাকেন। আমারও এটা হয়, সবোর্চ্চ সঙ্গতি বিধান করে আমি একটা বিষয়কে অপরটির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে চাই। এর জন্য আমি সচেতনভাবে শব্দের বিচ্যুতি ঘটাই, তার স্থানচ্যুতি করে থাকি। অবশেষে যখন এটি আমাকে তৃপ্তি দেয়, আমি তৃপ্ত হই।

শারমিন

অ্যাট্যাক আছে তোমার লেখায়, এটা কি দায়বদ্ধতা থেকে, দায়বদ্ধতার বিষয়টাকে কিভবে দেখ কবিতায়, থাকা উচিত, অনুচিত, বা কোনটাই না, যা হয় তাই- কোনটা?

মাইদুল

এখানে উচিত-অনুচিতের বিষয়টা বোধহয় আসেই না। মানুষ হিসেবে কতকটা দায় আমার থাকছেই। গাছও গাছ হওয়ায় গাছেদের প্রতি দায়বদ্ধ। পরবর্তী গাছটি যাতে ফলে উঠে, পূববর্তী গাছটি সেটি নিশ্চিত করে। আমি যখন কবিতা লিখছি, তখন কবিতার প্রতি দায়বদ্ধতা থাকছেই, সেটি যাতে কবিতা হয়ে ওঠে, সেটা আমাকে নিশ্চিত করতেই হয়।

শারমিন

কিন্তু কবিতা হয়ে ওঠার কোন হিসাব তো নাই। নিজের বিচারই তো শেষ বিচার, নাকি? আর কম্যুনিকেট করতে পারলাম কিনা সেটা একটা বিষয় তাই না? এইটুকুর জন্যই বোধহয় কবিতায় পাঠক চলে আসে, কি বল? আমার প্রশ্ন শেষ।

মাইদুল

কবিও তো মানুষের মতোই ভাবে, আর দেশকালে অপরাপর মানুষদের মতোই তার যাপিত জীবন। সুতরাং যখন কোন পংক্তি আমাকে নাড়া দেয়, আমি ধরেই নিতে পারি সেটা অপরকেও নাড়া দেবে। এবং এই বিষয়টায় আমি অত্যন্ত আস্থাবান। যখন কোন কবিতা আমার ভাল লাগে, আমি নিশ্চিত জানি সেটা আরো কয়েকজনের ভালো লাগবেই। এটা যদি না হতো আমরা তাহলে কবিতা প্রকাশ করতাম না। লিখে ফেলে রাখতাম। আমিও পাঠক, পাঠকও একজন পাঠক; ব্যাপারটা অনেকটা এরকম আমার কাছে। ধন্যবাদ শারমিন রাহমান।


যখন কবির নামহীন একটি কবিতা পড়ে উপলব্ধি করলেন যে, এইটা মাইদুলের লেখার মতো, সেই লেখাটা তখন আমার মতো হইলো। অর্থাৎ আমি মাইদুল মাইদুলের মতো লিখি। মতো শব্দটা কিন্তু শতভাগ আস্থার উপরে বলা হয় না। কিছুটা (সামান্য মাত্রায় হলেও) সন্দেহ তাতে থাকেই। এই সন্দেহটা ইতিবাচক, কোন কিছুতেই মাইদুল যে পুরোপুরি মাইদুল হতে পারে না, এটা তাই নিশ্চিত করে। মাইদুল সকল সময়েই অপরাপর মাইদুলেরই মতো।


শামশাম

শব্দের এই স্থানচ্যুতি এইটা তো চিন্তারও চ্যুতি ঘটায়। আর যখন বললেন, সচেতনভাবেই তা করেন। এর অর্থ, আপনার চিন্তাও চ্যুত হচ্ছে! বিষয়টা তেমনই কিনা?

মাইদুল

হ্যাঁ, ঘটায়ই তো, শামশাম তাজিল। শব্দের মিশেল তো চিন্তারও মিশেল। কিন্তু সেটা যেন আমার অধিত বিষয়টাকে ছাড়িয়ে যেতে না পার, সেদিকেও দৃষ্টি রাখি আমি। এবং আপনিও। একটা কবিতা অত্যন্ত জটিল একটি ভাষিক কাঠামো। যে কারণে একটা কবিতা নিয়ে সীমাহীনভাবে বলা যায়, এবং তা কখনোই নিঃশেষ হয়ে যায় না। ভাষার আশ্রয়ে কবিতায় যত বেশি জটিলতার সংমিশ্রণ করা যায়, সাহিত্যের অপর কোন মাধ্যমে সেটা হয় না। এর একটি কারণ আপনার উপরোক্ত সন্দেহটি। একটি কবিতা তার রচয়িতার কাছেও অনেক সময় দুর্বোধ্য হয়ে উঠতে পারে। সেটা কিন্তু রচয়িতার মানবসুলভ সীমাবদ্ধতা, তার ব্যর্থতা নয়। কেননা একজন মানুষ তার চিন্তাস্রোতকে সব সময় সমানভাবে নিয়ন্ত্রণ ও বশীভূত করে রাখতে পারে না। চিন্তা তার ডালপালাগুলো বহুদিকে বহুভাবে বিস্তৃত করে, মানবের চেতনে ও অবচেতনে। চেতনার স্পষ্টতা আর অবচেতনা অষ্পষ্টতা মিলেই কবিতা অনেক সময় দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে।

শামশাম

একটা কবিতা তার রচয়িতার কাছেও দুর্বোধ্য হয়ে উঠতে পারে। কথাটার সাথে দ্বিমত করব না। শুধু বলতে চাই, দুর্বোধ্যতা আমাদেরকে নতুনভাবে চিন্তা করতেও উৎসাহিত করে! আপনার কী মনে হয়? এই প্রশ্ন করার কারণও রয়েছে। আপনার কবিতায় চিন্তার চাষ হয়।

মাইদুল

আমার এমন মনে হয়, পূর্বের কবিতাটির খানিক অষ্পস্টতা থেকেই পরের কবিতাটি রচিত হয়। অতৃপ্তিও এক ধরণের অষ্পষ্টতা। কবিতার উৎস হিসেবে আমরা অন্য কোন কবিতার দিকেই যাইতে বাধ্য। কেননা জীবনের প্রথম কবিতাটি যে লিখছে, সে অপর কোন কবির আশ্রয়েই সেটি লিখছে। আমরা যখন পাঠ করি, ধরুন অতি সরল একটি কবিতা; সেই কবিতাটি কিন্তু আসলেই তত সরল নয়, যতটা আমরা ভাবি। এবং সেটি যদি আমাদের অন্য একটি কবিতার দিকে ধাবিত করে, তাহলে বুঝতে হবে সরল কবিতাটিরই অনেক গরল আমি আত্মস্থ করে উঠতে পারি নি। আমার ভিতর তাই বলবার জায়গা তৈরী হচ্ছে। সেই ফাঁকটাকে ভর্তি করাই যেন আমাদের লক্ষ্য, যেটি এখনো আমাদের আনায়ত্ত্বে। আর এসবের জন্য নিজস্ব একটা ভাববার জায়গা আপনিতে তৈরী হয়ে উঠে, নিজের নিজের রূচির উপর ভর করে।

মোস্তফা হামেদী

দুর্বোধ্যতার আসলে রকমফের আছে। ব্যক্তিভেদে এইটা আলাদা আলাদা। ফলে কবির এইটা নিয়ে মাথা না ঘামানোই ভালো। জগতে হয়তো সকলের কাছে সুবোধ্য কোন কবিতা নাই।

মাইদুল

মোস্তফা হামেদী, ব্যক্তিক ভাবনার বহুমুখিতাই এর কারণ। আমি যেটা আমার অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে বললাম, সেটি আপনি আপনার অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে বুঝতে চেষ্টা করেন। সুতরাং দুবোর্ধ্যতা অনিবার্য। আর এইটা কবিতার জন্য আমি স্বাস্থ্যকরও মনে করি। ধরুন, যখন আমি জীবনানন্দ পাঠ করছি, জীবনান্দকে বুঝবার চেষ্টা করছি। আর সেটা তো জীবনানন্দের দৃষ্টিতে হওয়ার নয়…

হামেদী

ফরাসি কবিতা পড়তে গেলে আপনার কবিতার কথা মনে পড়ে যায়। দাদাইস্ট ও সুররিয়ালিস্টদের কাজের কিছু ব্যাপার আপনার মধ্যেও ঘটে। যেমন ধরেন, শব্দের স্থানচ্যুতি, বাক্যের সনাতন শৃঙ্খলা ভেঙে দেওয়া, ভাঙা ভাঙা ইমেজ ইত্যাদি। এইটা কি আপনি সচেতনভাবেই করেন?

মাইদুল

সুররিয়ালিজম বা দাদাইজমের যে কাব্যকৃতি তা আমি অনেকের মতোই অনুবাদে পাঠ করছি। এবং আমার বলতে লজ্জা নাই যে, তার থেকে আমি খুব আলাদা কোন লক্ষণ বের করতে পারি নাই। বরং খুবই বিচ্ছিন্ন আলগা আলগা সংগ্রহশালা গড়ে উঠছে, যেটাতে অন্য অনেক অনুবাদ পাঠের মিশ্রণ আছে। এবং এগুলো নিশ্চয়ই আমার ভেতরে কাজ করে, কিন্তু সচেতনভাবে আমি তাদের বুঝতে পারি না। আমার কবিতায় যে বিন্যাস, তার যে গঠন কাঠামো সেটা একান্তই আমার বলে মনে করি। এবং সেজন্য এর পেছনে নিরলসভাবে লেগে থাকি। বোধের জায়গায় সকল মানুষই একটা প্রায় সুষম অবস্থানে থাকে, কবিতায় সেটা কীভাবে উঠে আসছে, সেইটাই বিবেচ্য। আমি এখানটাতেই জোর দেই বা বলা যায় এই প্রকাশভঙ্গির উপরেই আমার বেশিরভাগ মনোযোগ। সেটাকে সচেতনভাবে দাঁড় করানোতেই আমার সফলতা বা বিফলতা।

হামেদী

আপনি বলছেন যে, আপনার কবিতার গঠন বিন্যাস একান্তই আপনার। এই বিন্যাস কি একদমই মৌলিক? শিল্পে মৌলিকত্বে আপনি বিশ্বাস করেন?

শাহ মাইদুল

উত্তর এক কথায়, না। দেখুন আপনি যখন কবির নামহীন একটি কবিতা পড়ে উপলব্ধি করলেন যে, এইটা মাইদুলের লেখার মতো, সেই লেখাটা তখন আমার মতো হইলো। অর্থাৎ আমি মাইদুল মাইদুলের মতো লিখি। মতো শব্দটা কিন্তু শতভাগ আস্থার উপরে বলা হয় না। কিছুটা (সামান্য মাত্রায় হলেও) সন্দেহ তাতে থাকেই। এই সন্দেহটা ইতিবাচক, কোন কিছুতেই মাইদুল যে পুরোপুরি মাইদুল হতে পারে না, এটা তাই নিশ্চিত করে। মাইদুল সকল সময়েই অপরাপর মাইদুলেরই মতো।

হামেদী

এই অপরাপর মাইদুলের উদ্ভব তো ভাষার মধ্যেই ঘটে। ভাষা যেহেতু আল্টিমেটলি বহু স্বরের কম্পোজিশন, ফলে অপরাপর মাইদুলগণ অপরাপর ব্যক্তিবর্গের প্রভাবকে কীভাবে অস্বীকার করবে?

মাইদুল

অপরাপর ব্যক্তিবর্গ ও পরিপ্বার্শের বিচিত্র প্রভাবেই যেখানে মাইদুলরা গড়ে-পিঠে ওঠে যেখানে প্রভাব অস্বীকারের প্রশ্নে না গিয়ে বরং প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি জীবনানন্দ বা বিনয় বা অমুকের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছি এইটা যখন কেউ উপলব্ধি করে, তখন সে আসলে যথাসম্ভব প্রভাবমুক্ত হয়ে উঠে। এইখানে একটা চমৎকার ব্যাপারও মনে আসলো, যদিও এইটা আমার ক্ষেত্রে এইরকম করে কাজ করেনি-যতটা এখানে বলছি, প্রভাব ব্যাপারটা কবির জন্য নিজের নিজস্বতা উপলব্ধি করার একটা মানদন্ড হতে পারে।

হামেদী

সেটা হইতে পারে হয়তো আপনার ক্ষেত্রে। কিন্তু যে ভাষিক বাস্তবতার মধ্যে আমরা থাকি, কোনো না কোনো জায়গা থেকে শুরু করতে হয়। ফরাসি কবিতার ব্যাপারগুলো আপনার ঐভাবে বেজ লাইন হিসাবে কাজ করেনি বললেন। সেক্ষেত্রে বাংলা কবিতার ঐতিহ্যের মধ্যে আপনার প্রেরণার জায়গা আছে কিনা? মানে যেখানে আপনি এইভাবে ভাববার ও লিখবার সূত্র পেয়েছেন?

মাইদুল

ব্যাপারটা হলো অনেকের মতো আমারও মুগ্ধপাঠ শুরু হয়েছে জীবনানন্দ দিয়ে। আর জীবনানন্দে ভাববার ও লিখবার সূত্রের অভাব বোধহয় কোন কালেই হবার নয়। এরপর যে কবিতে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম এবং এখনো আছি, তিনি হলেন বিনয় মজুমদার। তারপর অনেককে অনেকভাবেই পাঠ করেছি, কিন্তু এতোটা অস্থি-মজ্জা-রক্ত-মাংস সমেত আর কেউ আমাকে খুবলে ধরেনি। এক অর্থে আমার পড়বার ব্যপ্তি খুব বিশাল নয়, আর তাই অবলম্বনও বেশি কেউ ছিল না। এখনো নেই। তাতে অবশ্য আমি সামান্যতম আক্ষেপও করছি না।

হামেদী

আপনি যে দু’জনের নাম করলেন,আপনার লেখার মধ্যে অবশ্য এদের আমি খুবই সামান্যও হয়তো খুঁজে পাই না। আপনার লেখা বরং অনেক ক্ষিপ্র গতির। যেটা মুগ্ধকর। এবং আপনার যাবতীয় ভাংচুড় এই গতিপ্রবাহের মধ্যে সাধিত হয় বলে, অনেক কিছুই জায়েজ হয়ে যায়। উৎপলের নানা ধরনের নিরীক্ষা আছে। সেখানে হয়তো কিছু সূত্র পারি। কিংবা অন্য কোথাও। এই মুহূর্তে আমার একজন অকাল প্রয়াত কবির কথা মনে পড়ছে, রকিবুল হক ইবন, তাঁর ‘উপমানব’ নামক কাব্যে বাক্যের বিন্যাসের ভিন্ন রকম এক্সপেরিমেন্ট ছিল। শামীম কবিরের কিছু কিছু লেখাও সম্ভবত এ ধারার হতে পারে। স্মৃতিশক্তি সাপোর্ট করতেছে না বলে ডিটেইল বলতে পারলাম না। হা হা হা।

দ্বিমত থাকলে বলতে পারেন আপনি বা অন্য কেউ।

মাইদুল

আশ্চর্যের বিষয় হলো, উৎপলের কথা আমি সচেতনভাবে জানতে পারি ২০১৬-তে এসে। কবি সাম্য রাইয়ান একটা গদ্য লিখবার জন্য উৎপল কুমার বসুর একটি সমগ্র পিডিএফ আকারে আমাকে দেন, সেখানে আমি তাকে পড়ি। ২-১ দিন খুব তোড়জোর করে পড়ছি, কিন্তু পিডিএফ ফাইলে যত তোড়জোড়ই হোক, পাঠ বেশি এগুনো যায় না, আমিও পারিনি। এই হলো আমার উৎপলসঙ্গ। আর বাকী যাদের আপনি নাম নিলেন তাদের আমি পড়িনি।

হামেদী

যাই হোক, আমার মতো করে বললাম। ভবিষ্যতে হয়তো মাইদুল গবেষকরা তাদের মতো করে একটা বেজ লাইন তৈরি করবেন।

মাইদুল

হা হা। তবে আপনাকে কিছুটা সূত্র আমি দিতে রাজি আছি।

হামেদী

আচ্ছা। বলেন …..

মাইদুল

একজন রুমানিয়ান কবি, জর্মনে যিনি লিখেছেন এবং আত্মহত্যা করেছিলেন সম্ভবত নদীতে ঝাপ দিয়ে। পল সেলান, আমার লেখায় যার উপস্থিতি পেতে হয়তো কষ্ট কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে না। আরো একজন, হ্যাঁ ফরাসী (আগে ভুলে গিয়েছিলাম হয়তো) র‌্যাবো এবং আরো একজন অ্যামেরিকান কবি সিলভিয়া প্লাথ। সাকুল্যে এই পাঁচ জনের কাছে আমি আমারে বিলি-বন্টন করে দিতে রাজি আছি, মোস্তফা হামেদী।

হামেদী

ধন্যবাদ। এই তথ্য গবেষকদের বেশ উপকারে আসতে পারে।

শামশাম

অনেক কিছুই মিস করে ফেলছি! মাইদুলকে বুঝতে এখন মনে হয় অনেকের পক্ষে সম্ভব হবে!

মাইদুল

হাহা, হামেদী ভাই হাসতে আছি…

হামেদী

যাই হোক, আমি অবশ্য আপনার কবিতা পাঠ করি প্রেক্ষিতের কারণে। একটা ঘরোয়া ব্যাপার-স্যাপার পাই আপনার কবিতায়। যেটা, বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হয়, আপনার উপাদানগুলি চারপাশ মানে ঠিক আপনারই চারপাশ থেকে উঠে আসে। আকাশ-পাতাল ভাবতে হয় না।

মাইদুল

হুম, এটা হয়তো ঠিক বলেছেন, হামেদী ভাই। আমি আমার লেখার বিষয়গুলো স্পর্শে পাওয়া দূরত্ব থেকেই সংগ্রহ করি। আপনার কথাগুলো পড়ে আমার এমনটাই মনে হচ্ছে এখন। নিজের সম্পর্কে এই তথ্যটা জানতে পেরে ভাল লাগছে।

হামেদী

দেখা হলে নিশ্চয়ই ভালো একটা খাওয়া দিবেন? হা হা হা

মাইদুল

নিশ্চয়, খাবেন ভাই।

হামেদী

নিশ্চয়ই।

মাইদুল

শামশাম ভাই গেল কই?

শারমিন

সংবেদনশীলতাই মূল তো মাইদুলের। রেফারেন্সগুলা টানার ফলে এই কথা বললাম।

মাইদুল

খুব সম্ভবত, তাই। এটাই হয়তো আমার জায়গা।


কে না জানে প্রয়োজনই মানুষকে দৌড়াতে শেখায়। তাই বর্তমান ইউরোপিয় নন্দনতত্ত্বের যে প্রতাপ আমাদের অঞ্চলে সেটা এখন আমাদেরও নন্দনতত্ত্ব। এটাকে অস্বীকার করে কোনভাবেই আগানো সম্ভব বলে মনে হয় না।


হামেদী

আপনার ‘হলুদবন’ কবিতায় দুইটা লাইন আছে এরকম-“আমাদের প্রয়োজন ছিল একত্রে গোল হয়ে বসা। আমাদের প্রয়োজন ছিল গোল হয়ে একত্রে বসা।”সৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরল দিনের সারাজীবন’ কাব্যনাট্যের প্রস্তাবনা অংশে আছে -আসুন সকলে, গোল হয়ে বসুন।”মিলে যায় মনে হয়,কিছুটা?

শারমিন

মাইদুল এখনি বলবে মনে হয় নুরলদিন পড়ে নাই।

মাইদুল

হাহা আসলেই পড়ি নাই। আমি এখন কই যাই…

শারমিন

এইজন্যই তুমি মাইদুল। তোমার জন্য ভালবাসা।

হামেদী

চোখে পড়ে। এইজন্য বলা আর কী!

মাইদুল

ভালোবাসা, দিদি। আর হ্যাঁ হামেদী ভাই, শামসুল হকের বইটা খুব শিগগিরই পড়ে ফেলবো ভাবছি।

রুহুল মাহফুজ জয়

হকের লাইন এরকম “গোল হয়ে আসুন সকলে, ঘন হয়ে আসুন সকলে।” এটার সাথে আমি মাইদুলের লাইন দুইটার কোন মিল দেখি না।

হামেদী

প্রেক্ষিতটা সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু ঐ ‘গোল’ শব্দটা গোল বাঁধায় আর কী। ভাটি বাংলার শিল্প ঐতিহ্য বিশেষ করে কাব্যগান খুবই সমৃদ্ধ। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তের শিল্প চর্চায় এগুলো এসিমিলেইট করাটা সম্ভব কি না, এই সময়ে এসে? যেটা রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন অনেকখানি তৎকালীন নদীয়া অঞ্চলের বাউলদের সংস্পর্শে এসে।

মাইদুল

সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে রবি ঠাকুরের উপরই। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, ঠাকুরের মতো যদি কেউ বাউলদের সাথে মেশার যোগ্যতা দেখায়, তাহলেই তা সম্ভব। এবং এটা অত্যল্প মাত্রায় হচ্ছেও বোধ করি, আমার জানা দু’একজন কবি তো এসবের সাথে জড়িত। সামতান রহমান এবং আরো দুয়েকজন যাদের নাম আমি এখন মনে করতে পারছি না। কিন্তু তারা কতোটা নিতে পারছেন, তা হয়তো এখনই বলা যাবে না।

হামেদী

ইংরেজ প্রণীত ইশকুল-কলেজে পইড়া বাউল সাজার ইচ্ছা আমার নাই। এইটা কাজেরও মনে করি না। আমি অন্য একটা বিষয় ভাবতেছি। তিরিশের কবিরা যে নন্দনতত্ত্বের উপর বাংলা কবিতারে খাড়া করায়া গেছে, সেখান থেকে নড়াইতে পারার ঘটনা ঘটতেছে না। সবাই যেন ঐ চক্রে ঘুরপাক খাইতেছি। আল মাহমুদ চেষ্টা করেছেন একা একা। অন্য কেউ মাঝে-মধ্যে হাত লাগাইয়া সইরা গেছেন। ম্যাসিভ আকারে মানে পুরা ফ্লো টা ঘুরে নাই। এইটা এখন ঘোরানো সম্ভব কি না? কিংবা জরুরি কিনা। নাকি আরও কিছুকাল ঘুরপাক খাওনের দরকার আছে?

মাইদুল

সম্ভাবনাটা অনেকটা আপনার প্রশ্নের ভেতরকার উপাদান থেকেই হালকা হয়ে যায়। আমি বলতে চাইছি, ইংরেজ প্রণীত ইশকুল-কলেজের কথা। এই শিক্ষা ব্যবস্থা ও এর থেকে উঠে আসা কারো পক্ষে কাজটা করা সত্যই দুঃসাধ্য। তেমন বড় কোন প্রতিভা এগিয়ে আসলে অবশ্য সম্ভব। ইউরোপিয় নন্দনতত্ত্বের আলোকে বর্তমানের যে শিল্পযাত্রা সেটার ভিত্তি ধীরে ধীরে আরো প্রসারিতই হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পারিবারিক আবহ পর্যন্ত তার বিস্তৃতি। তাই চাইলেই মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্য বা তারো আগের উপাদানগুলো নিয়ে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। এটা করতে হলে এমন প্রতিভার প্রয়োজন, যিনি একাধারে গবেষক ও সাহিত্যক দুটোই হবেন। অন্তত তার দৃষ্টিটা গবেষকের দৃষ্টির মতো তীক্ষ্ণ হতেই হবে।

শারমিন

রবীন্দ্রনাথ যা করে ফেলছেন, তা আবার করতে হবে কেন? আর রবীন্দ্রনাথ তো নিজেই ইংরেজপ্রণীত সবকিছুই গ্রহণ করছেন। এখন যা হবার আসলে তাই তো হইতে থাকবে, তবে আগের মত মাল্টিপল ট্যালেন্ট এখনকার সংস্কৃতিতে তৈরী হবে, সেটা আশা করাও হয় না। এখনকার সময়ে এখনকার মত করেই প্রতিভার বিকাশ হবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

হামেদী

প্রতিভা তো ধরেন আসমান থেকে পড়ে না। সমাজের মধ্যেই থাকে। এইটা প্রতিভার সমস্যা না। দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা। নিজেরে দেখতে না পাওনের সমস্যা। শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ট্রেন্ড সারা পৃথিবীতে এখন প্রায় একই রকম। তারপরও আদোনিস বা দারবিশের আরব কবিতা লিখতে সমস্যা হচ্ছে না। কিংবা হিমেনেথদের স্প্যানিশ কবিতা। ফরাসিদের ফরাসি কবিতা। কোরিয়ানদের কোরিয় কবিতা। খালি বাঙালিদের বাংলা কবিতা লেখতে সমস্যা।

শারমিন

কেন আপনার মনে হইল বাংলা কবিতায় সমস্যা হচ্ছে? এই ব্যাপারে মাইদুল কি বলো? আর অন্যরা কি বলেন?

হাসান রোবায়েত

বাংলা কবিতার সমস্যা বলতে ঠিক কী মিন করেন শারমিন আপা?

শারমিন

আমি বলি নাই। হামেদী ভাই বলছে।

হামেদী

বাংলা কবিতা এখন ফরাসি, স্প্যানিশ, আরব, জর্মনসহ আরও নানান ভাষার কবিতার সাথে বাংলার প্রলেপ যুক্ত হয়ে লেখা হইতেছে।

রোবায়েত

হামেদী ভাই সম্ভবত আন্তর্জাতিক না হইয়া দেশের হইতে বলতেছেন কবিতারে।

হামেদী

বাংলা কবিতার মধ্যে বাংলার টেস্ট আমি খুঁজতে চাইতেছি।

শারমিন

কোন কোন কবিতা একদম দেশীয় উপাদানে হবে, কোন কবিতা শংকর হবে, সমস্যা কি তাতে? হ। আমিও বাংলা কবিতায় আমার চেনাজানা জগৎরেই দেখতে চাই।

রোবায়েত

না না। সমস্যা তো নাই। কেউ তো ঠিক করে দিচ্ছে না। ডিবেট হইতে পারে এইটা নিয়ে।

শারমিন

ভাষার লক্ষ্য তো পিওরিটি না। কম্যুনিকেইট করা। সেই হিসাবে সব রকম চেষ্টাই একই ভাষায় হতে পারে।

জয়

শারমিন আপা, আমরা মাইদুলরে বলার সুযোগ দেই?

হামেদী

যে যার যার মতো লিখুক। সেখানে তো আমি বাধা দিতে পারি না। কিন্তু আমি বাংলা কবিতার মধ্যে বাংলারে পাইতে চাই।

মাইদুল

মোস্তফা হামেদী, এটা আপনার ক্ষোভের কথা। তিরিশ ও তার পরবর্তী সময়ের কবিতাগুলোকে কী আপনি বাঙলা কবিতা বলতে চাইছেন না? আর তিরিশের কবিরা এই অঞ্চলেরই মানুষ ছিলেন, তারা যে ইউরোপমুখী হয়েছেন, সেটাকে আসমান থেকে পড়াও বলা যায় না। আমি বলতে চাইছি তাদের এই যাওয়াটা অনিবার্য ছিল। যে কোন কারণেই হোক না কেন, নতুন লেখার যে স্পৃহা তাদের মধ্যে কাজ করছিল, তা দেশীয় উপাদানগুলো মেটাতে পারছিল না। আর কে না জানে প্রয়োজনই মানুষকে দৌড়াতে শেখায়। তাই বর্তমান ইউরোপিয় নন্দনতত্ত্বের যে প্রতাপ আমাদের অঞ্চলে সেটা এখন আমাদেরও নন্দনতত্ত্ব। এটাকে অস্বীকার করে কোনভাবেই আগানো সম্ভব বলে মনে হয় না।

জয়

ইউরোপের নন্দনতত্ত্ব আমাদের হবে কেন, মাইদুল? ল্যাটিন অঞ্চলে তো ইউরোপ রাজত্ব করতে পারে নাই। আমাদের এখানে কেন পারে?

হামেদী

এটা মোটেও ক্ষোভ প্রধান ব্যাপার না। আমার বক্তব্য হচ্ছে, ইউরোপীয় ধারার কবিতার যে ব্ল্যাকহোলের মধ্যে আছি এইখান থেকে বের হওয়ার রাস্তাগুলি আমরা খুঁজতে পারি। আমাদের মধ্যে মেধার ঘাটতি নিশ্চয়ই নাই। বিষয়টাকে ফিল করার ব্যাপার। সেইখানে কী কী উপাদান আমাদের কাজে লাগতে পারে সে আলোচনা/তর্ক আমি তুলতে চাই। এবং তর্কটা হওয়া এখন জরুরী। কেননা, নিজেদের আইডেন্টিটি প্রতিষ্ঠা দরকার।

মাইদুল

আমাদের অঞ্চলে একটা সমস্যা আছে, রুহুল মাহফুজ ভাই। আমরা কাজে করি, মুখে স্বীকার করি না। বা মুখে স্বীকার করি, কাজে করি না। এই ব্যাপারটা আমাদের মাঝে দীর্ঘদিনের বিদেশী শাসনের প্রভাব বলে মনে করি। আমাদের বর্তমান সাহিত্যিক কর্মকান্ডগুলো তো ইউরোপিয় নন্দনতত্ত্বের আলোকেই হচ্ছে। আমাদের সময়ে যারা লিখছেন, তাদের প্রায় সকলেই তিরিশ ও তিরিশ পরবর্তী কবিদের কাছ থেকে লেখার দীক্ষা নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। আর তিরিশের সময়টাকে যদি আমরা ইউরোপ প্রভাবিত ভাবি, তাহলে বর্তমান সময়টা এর বাইরে হয় কী করে? কিন্তু আমরা আমাদের লেখায় আমাদের প্রতিবেশকেই ফুটিয়ে তুলি। ইউরোপকে না। তাই তত্ত্ব যা কিছুই বলুক না কেন, এ আমাদেরই, কেননা আমরা কাজে তাই করছি।

রোবায়েত

মাইদুল কেমন আছেন?

হামেদী

কিন্তু আমাদের কাজের ভাঁজে ভাঁজে ইউরোপ উৎকটভাবে ‘হা’ হয়ে থাকে।

মাইদুল

ভালো আছি, হাসান রোবায়েত।

হাসান

আড্ডা কিন্তু ব্যাপক লাগতেছে আমার। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে ফেলছেন।


আমি লেখা প্রচুর পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে থাকি। সেটা যখন করি তখন আমার কল্পনায় এর একটা রূপ দাঁড়িয়ে যায়। আমি চেষ্টা করি যতটা সম্ভব এই অকথ্য রূপটার কাছাকাছি যেতে। এটা একটা খেলার মতো যেন।


জয়

রোবায়েত, এখন আমার আরেকটা প্রশ্ন আছে। এই ইউরোপিয়ান ঘরানা থেকে বের হবার উপায় কি কি?

মাইদুল

আমাদের কোন কোন উপাদান হবে কেন, আমাদের সমস্ত উপাদানই আমরা কাজে লাগাতে পারি, যদি আমাদের সে সামর্থ্য থাকে। কিন্তু তত্ত্ব এক জিনিস আর তার ব্যবহারিক রূপ অর্থ্যাৎ উপাদানের সমন্বয় আর এক জিনিস। আমরা যখন একটা কবিতা লিখি তত্ত্ব নিয়ে আমরা ভাবি না, সেটা স্বতস্ফূর্তভাবেই আমাদের কাজে সেঁটে যায়। এখন আপনার কথামতো যদি আমাদের দেশীয় তত্বেই সাহিত্য রচনা করতে হয়, তাহলে আমার প্রশ্ন আমাদের সামনে নন্দনতত্ত্বটা কি থাকবে? ভারতীয় নন্দনতত্ব বলতে আধুনিক কোন তত্ত্বের অস্তিত্ব আছে কি? যেটা আমরা আমাদের কাজে প্রয়োগ করতে পারি?

জয়

এই যে আমাদের নন্দনতত্ত্ব খাড়ায় নাই, আমরাই তো খাড়াইতে দেই নাই মনে হয়। কারণ আমরা অন্যদেরটাই সামনে রাইখা দৌড়াইছি। আপনার কি মত?

মাইদুল

বের হবার জোর প্রস্তাবটাই, বের হবার প্রকট অন্তরায়, রুহুল ভাই।

জয়

আমাদের সামনে তো চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মৈমনসিংহ গীতিকা, লালন ছিল, চণ্ডীদাস ছিল

হামেদী

বাংলার নন্দনতত্ত্ব তো তৈরি হইতেছিল ভারতচন্দ্র পর্যন্ত। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ঘি খাইয়া যে গণ্ডগোল বাধছিল, ঐটা সারে নাই। বহু জিনিস আছে নেওনের।  সেলিম আল দীন তো চর্যাপদ থেইকা বাংলা নাটকের ফসিল আবিষ্কার করছেন।

রোবায়েত

আপনারা কি ফর্মের কথা বলতে চাইছেন নাকি কন্টেন্ট? হামেদি ভাই

মাইদুল

বের হওয়া বলতে কিছু সম্ভবত নাই। কেননা আমরা কোথাও সত্যিই ঢুকিনি, যে বের হবো। আলো বাতাসের মতো যে ব্যপারটাকে আমরা গ্রহণ করেছি, সেটাতে ঢোকাঢুকির কোন ব্যাপার ছিল না। এটা স্বতঃস্ফূর্ত একটা ব্যাপার।

জয়

ফর্ম, কন্টেন্ট দুটোই, রোবায়েত। মাইদুলের এই যুক্তিটা ভালো।

হামেদী

ফর্ম, কন্টেন্ট দুইটাই খুঁজতে পারি। স্বতঃস্ফূর্ততার পেছনে সবসময়ই কোনো না কোনো দার্শনিক বেজলাইন থাকে।

রোবায়েত

আমার কেন জানি মনে হয়, ফর্মটাই বেশি নিয়ে ফেলছি আমরা। অবশ্য কন্টেন্টটাও নিছি। নেওয়াতে দোষ নাই। তবে নিজেদের সমৃদ্ধ সাহিত্যকে অনেক বেশি এড়ায়া গেছি।

যেমন ধরেন, আমাদের রবীন্দ্রনাথের শিল্পচিন্তার ঢেউ লাগে স্পেনে। হিমেনেথ লিখে ফেলেন ‘প্লাতেরো অ্যান্ড আই’ । এইটা কিন্তু বিরাট ব্যাপার ইস্টের জন্য।

মাইদুল

হাহা, হামেদী ভাই, আপনি যে দার্শনিকতার কথা বললেন সেটা ইউরোপিয় দার্শনিকতাই। আপনি জানেন যে, ইউরোপিয় দার্শনিক ঐতিহ্য আর ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের মধ্যে একটা মোটা দাগে ব্যবধান আছে। ইউরোপিয় দার্শনিক ঐতিহ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ধারাবাহিক প্রবাহমানতা বিদ্যমান, যেটা ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যে নাই। এখানে দার্শনিক সমস্যাসমূহ পর্যায়ক্রমিকভাবে সমাধানের কোন চেষ্টা হয়নি। একটা জায়গায় এসে স্রেফ আটকায়ে গেছে। সুতরাং ভারতীয় আধুনিক সাহিত্যে ভারতীয় দার্শনিক বেজলাইন খুঁজতে যাওয়া প্রায় অমূলকই।

হামেদী ভাই, নেওনের ব্যপারটা তো সব সময়ই উন্মুক্ত। আমরা সমস্ত কিছুই নেবো এবং কোন রকম শোরগোল না করেই। যদি আপনি বলেন যে, জিনিসগুলো আমাদের তা থেকে নেওয়াটাও তো স্বাভাবিকভাবেই হওয়া উচিত। খুব আয়োজন করে কেউ নিজের জিনিস নিজে নেয় না। হাসান ভাই, তারপর?

রোবায়েত

আপনেরা যে ভারী ভারী কথা কন ভাই। কিছুই বুঝি না।

মাইদুল

অমিও বুঝি না ভাই।

শারমিন

জয়, এড়ায়ে না যেতে হইলে স্কুল কলেজে বাংলা পাঠ্যবইয়ে মধ্যে এইসব ঢোকাতে হবে। ওইটাই সার্বজনীন। মূল তো মূল জায়গায় না থাকলে হবে না।

রোবায়েত

আপনার নেক্সট কাজ নিয়ে আমি খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেছি। আপনার বইয়ে বাক্যের বেশ রিপিটেশন দেখি। অনেক কবিতাতেই সেটা আছে। এইটা মাঝে মাঝে আমার পাঠকে মনোটোনাস করে তোলে। তো, অনেক কবিতাতেই এইটা আপনি কেন রাখেন?

শাহ মাইদুল

ইদানিং একটা আইডিয়া অবশ্য আছে লেখা নিয়ে। আপনাদের সাথে শেয়ার করি, যৌনতাকে মধ্যমনি করে একটা পুরো বই করার কথা ভাবছি। যদি পর্যাপ্ত লেখা করে উঠতে পারি, তাহলে তৃপ্তিদায়ক একটা কাজ হতে পারে সেটা, অন্তত নিজের জন্য।

হয়তো যে কথাগুলো রিপিট করি, সেগুলোর উপরে আলগা জোর দিতে চাই। চাপ সৃষ্টিও হতে পারে।

রোবায়েত

এইটা অবশ্য পুরনো প্রসেস। আপনি জাস্ট সেইটারে একই বাক্যেই লুপের মতন ঘোরান। আগে যেটা ছিল কয়েক লাইনের পর। আপনার এই কাজটা আপনার সিগনেচার ক্রিয়েট করে। কিন্তু একই টেক্সটের মধ্যে বার বার সেইটা মনে হয় একটু ক্ষতিও করে ফেলে। মানে, টোটাল কম্পোজিশানে।

মাইদুল

হতে পারে। কিন্তু আমি লেখায় আসলে প্রথমে বিষয়টা স্থির করি। সেটা নিজের কাছে পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত থামতে পারি না। তারপরো আপনার কথাটা ভেবে দেখবো, হাসান ভাই।

রোবায়েত

কবিতার পাঠক হিসেবে সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার কোনো সংকট আছে বলে মনে হয় আপনার?

মাইদুল

যদিও বলা হয়ে থাকে, এই দশকে বিচিত্র ফর্মে কবিতা চর্চা করা হচ্ছে। তবুও আমার কাছে সেটা পর্যাপ্ত বলে মনে হয় না। আমি চাই আরো বিচিত্র উপায়ে কবিতা চর্চা হোক।

রোবায়েত

আমারও মনে হয়। আপনার কাজ অবশ্য আমাকে সেই আশা দেয়। নতুন কী কী ধরনের কাজ হইতে পারে বলে মনে হয়? ধরেন ফর্মের দিক দিয়ে?

মাইদুল

সেটা স্পষ্ট করে বলা কী আদৌ সম্ভব! তবে আমরা আশা করতে পারি সেটা বিচিত্রগামী হবে।

রোবায়েত

টানাগদ্যে তো প্রচুর কাজ হলো। আপনার বেশ কিছু লেখা টানাগদ্যে। তো, এই টানাগদ্য আপনার লেখার পেছনে কি বিশেষ কোনো কারণ আছে?

মাইদুল

না। লেখার মেজাজের সাথে যখন যেটা খাপ খায়, তখন সেভাবেই লিখি। লেখার সাথে বাহ্যিক অবয়বটা গেলেই আমি খুশি।

রোবায়েত

বাহ্যিক অবয়বটা বেশ মজার জিনিস। আপনি কীভাবে এইটা ঠিক করেন?

শাহ মাইদুল

আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দায়ক এই কাজটা। আমি লেখা প্রচুর পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে থাকি। সেটা যখন করি তখন আমার কল্পনায় এর একটা রূপ দাঁড়িয়ে যায়। আমি চেষ্টা করি যতটা সম্ভব এই অকথ্য রূপটার কাছাকাছি যেতে। এটা একটা খেলার মতো যেন। অনেক নিখাদ আনন্দের কারণ এই ব্যাপারটা আমার কাছে।

রোবায়েত

আপনাকে সম্ভবত এই কারণেই ঈর্ষা করা যায়। হা হা

মাইদুল

ঈর্ষাই কবিকে বাঁচিয়ে রাখে। ঈর্ষার জয় হোক।

জয়

মাইদুল, কেমন থাকেন বিচ্ছিন্নতার ভেতর?

শাহ মাইদুল

বিচ্ছিন্নতা বলতে কী বোঝাচ্ছেন? কবিদের থেকে দূরে থাকা? নাকী অন্য কিছু?

শামশাম

বিচ্ছিন্নতা কী, তার উত্তর দিতে থাকুন। তার আগে আমি যা বুঝেছি, তা বলি। আপনার কবিতা কিন্তু মোটেই বিচ্ছিন্নতার চাষ করে না। আপাত আড়াল থাকলেও আপনি ঠিকই মানুষের কথাই বলছেন। তা এই আপাত আড়াল, শব্দবিন্যাস, ঠিক কী কারণে? আঙ্গিক ঠিক কোন কারণে আপনার কবিতায় প্রাধান্য করে? যদিও এইসব নিয়ে এর মাঝেই কিছু কথা আপনি বলে ফেলেছেন। তাও আরও কিছু জানার আগ্রহ থেকেই এই জিজ্ঞাসা।

মাইদুল

আড়াল কখনোই পুরোপুরি আড়াল নয়। হলে এই পর্যন্ত আসাটা আমার হয়ে উঠত না। যতটুকু সম্ভব আমি আমার মাঝে থেকেই কাজ করে যেতে চাই। আর এটাই আসল কথা, শামশাম ভাই। আর আঙ্গিক, শব্দবিন্যাস ইত্যাদি বিষয়গুলো আমার চর্চার ফল। এবং এটাতে আমি অভ্যস্তও হয়ে গেছি।

জয়

নির্জনতা বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছি, আপনি কোন ডামাডোলে নেই। চুপচাপ কবিতা লিখে যাচ্ছেন। ফেসবুকেও কবিতা নিয়ে হম্বিতম্বি খুব একটা করেন না। এই স্ট্যান্স কি নিজের টেক্সটের উপর স্থির বিশ্বাসের কারণে?

মাইদুল

বিশ্বাসটা আমার ঠিকই আছে। নিজের পাঠের প্রতি আমি কোন অবিচার করতে চাই না। জানি যখন- যা হলো, তার থেকে বেশি হবার ক্ষমতা ওই পাঠটি হওয়ার সময় আমার ছিল না। সত্যিই এরপর আর কী কিছু করবার থাকে? সে ফেসবুকেই হোক, বা অন্য কোথাও। যা বলবার. বলা হয়ে গেলে. সকলই সুন্দর। হাহা

জয়

লক্ষ্য করেছি, আপনি মফস্বলে থাকার কারণে অনেকেই আপনাকে পাত্তা দিতে চাইতো না। কিন্তু আপনার টেক্সট ঠিকই সেসব মানুষের সমীহ আদায় করে নিচ্ছে। ব্যাপারটা কিভাবে দেখেন?

মাইদুল

আসলে দেখবার কিছুই নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে এর জন্য কী আর বলতে পারি! আসলেই বলবার কিছু নেই, অন্তত এখন।

জয়

এই যে আপনি বই নিয়ে, আপনার কবিতা নিয়ে উচ্চবাচ্য করেন না; তারপরও আপনার বই পাঠকের কাছে সমাদৃত হচ্ছে। এটা কি প্রমাণ করে না, কবিতাই আসল? কবি মফস্বলে থাকুন বা রাজধানীতে সেসব কোন ব্যাপার না?

মাইদুল

কবিতা আসল, যখন আমরা কবিতাই করছি। মফস্বল বা রাজধানী ইত্যাদি কবি নয়, এমনকি কবির মতোও নয়। আর আমার বইটির ব্যপারে আমার তখনই বাড়তি সব বলবার ক্ষমতা রদ করা হয়েছে, যখন সেটি একটি বই হিসেবে বের হয়ে গিয়েছে। প্রকাশিত বইয়ের ব্যাপারে কবির বলবার কিছুই নেই।

জয়

অনেকের তো ধারণা রাজধানীর বাইরে থাকেন বলে মূল্যায়ন হয় না। আপনি এবং আপনার কবিতা তাদের ভুল প্রমাণ করলো কী?

মাইদুল

ধারণা বিষয়ে বলতে বলছেন? হাহা। ভেবে দেখুন ধারণা নিয়ে আমরা কত কিছুই বলতে পারি। বলবো তবে…

জয়

বলুন

মাইদুল

আপনি খুব নাছোড়বান্দা। যাই হোক, কবি হিসেবে কবিতা হওয়া, না হওয়ায়ই আমাদের সমস্ত দম। এছাড়া যাবতীয় কথাই বাহানা। অর্থহীন। অবশ্য বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এর নড়চড় হতেও পারে।


বিনয় মজুমদারের একটা ছবি আছে, যেটিতে একটি হারিকেন হাতে কবি দাঁড়িয়ে আছেন। এই ছবিটার দিকে তাকালে আমি বুঝতে পারি কবিতা যাপন করা কাকে বলে। আমার খুব কষ্ট হয় তখন। আমিও এভাবেই নিজের বিনিময়ে কবিতাকে চাই। আমার মনে হয়, হায় মাইদুল; তুমি আর কবে হবে!


জয়

ঘোড়া ও প্রাচীর বিষয়ক – আপনার প্রথম বই। বইটিতে অনেক বানান ভুল থেকে গেছে। প্রচ্ছদটা নিয়েও অনেকের কাছে নেতিবাচক কথা শুনেছি। এসব বিষয়ে উদাসীন ছিলেন কেন?

মাইদুল

বানান ভুল খুবই নেতিবাচক একটি কাজ, একটি বইয়ের জন্য। এটা পীড়াদায়ক, এবং আমি পীড়িতও। ২য় মূদ্রণ যথাসম্ভব ত্রুটিমুক্ত করার ইচ্ছে রাখি। আর প্রচ্ছদ আমার নিজের করা। এবং এই নিয়ে এক ধরণের একগুঁয়েমিতেও আক্রান্ত। যা হোক, ২য় মূদ্রণে এটাও থাকছে না।

জয়

একগুঁয়েমিটা কেন ছিল?

মাইদুল

আমি জানি না। খুব অর্থহীন শুনালেও কথাটা।

জয়

আপনার কবিতায় যাপনটা খুব চোখে পড়ে, তার প্রকাশও আপনার নিজের মতোই। এটাই কি আপনার কবিতার মূল শক্তি?

মাইদুল

বিনয় মজুমদারের একটা ছবি আছে, যেটিতে একটি হারিকেন হাতে কবি দাঁড়িয়ে আছেন। এই ছবিটার দিকে তাকালে আমি বুঝতে পারি কবিতা যাপন করা কাকে বলে। আমার খুব কষ্ট হয় তখন। আমিও এভাবেই নিজের বিনিময়ে কবিতাকে চাই। আমার মনে হয়, হায় মাইদুল; তুমি আর কবে হবে!

জয়

বাহ্! আপনার এই যাপনকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এর বাইরেও তো কবিতা হয়। হয় না?

মাইদুল

আমি একজন, আর আমি এভাবেই ভাবি। এর বাইরের অভিজ্ঞতা সত্যই আমার নাই। প্রয়োজনও বোধ করি না।

জয়

আপনার একটা কবিতা আছে, হৃদয়ের বোনেরা। আমার ভাল লাগা কবিতা। হৃদয়ের বোন মূলত জন কিটসের ‘সৌলস সিস্টার’ থেকে জীবনানন্দর ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় নিয়ে এসেছিলেন। আপনার হৃদয়ের বোনেরা কি তা থেকে প্রভাবিত?

মাইদুল

আমি জানি না। আবার মনে হয় না-জানিই বা কেন? না জানা কিছু তো মনে আসতে পারে না? তাই যদি এমন (আপনার মনে হওয়াটা) হয়, আমি খুশি। যদি এমন নাও হয়, তাও আমি খুশি। ‘হৃদয়ের বোনেরা’ আমার নিজেরও খুব প্রিয়, খুবই। আর তাতেই আমি মনসম্ভব খুশি।

জয়

জীবনানন্দও ‘হৃদয়ের বোনেরা’ লিখেছিলেন।

মাইদুল

হ্যাঁ। এবং এখান থেকে এই শব্দদ্বয় আমার মাঝে আসতেই পারে। কিন্তু জ্ঞানত এটা হয়নি, অবেচেতনে হলেও হতে পারে। আর হলে আমার খুশিতে সেটা অন্তরায় কিছু নয়।

জয়

আপনার আরেকটি কবিতায় ‘মরে হেঁজে গেছে’ ব্যাপারটা আছে। উৎপলকুমার বসু ‘সলমা-জরির কাজ’ বইয়ের উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন, “প্রাপক-সে কোনকালে মরে-হেজে গেছে”। এটাও কি অবচেতনে? আর এরকম একটু-আধটু মিলে যাওয়াকে আপনি কিভাবে দেখেন?

মাইদুল

এটা আমি আজও পড়িনি। আর মিলে যাওয়াটা মিলে গেলে নিজেকে মানুষ মনে হয়, অতি প্রাকৃত কিছু হওয়ার থেকে তা হলে রেহাই পাওয়া যায়। হাহা।

জয়

তাহলে এক কবির টেক্সটের সঙ্গে আরেক কবির লেখা কিছুটা মিলে যাওয়াকে আপনি সমর্থন করেন?

মাইদুল

সমর্থনের/অসমর্থনের কিছু এখানে নেই। এটা হয়, হয়েই থাকে। আমার জৈবিক পিতা একজনই, কিন্তু আমার কবিতা জগতে পিতা একের অধিক। এমনকি চিরকুমার বিনয়ও একজন। হাহা।

জয়

কবিতা জগতের পিতা…ব্যাপারটা ভাল্লাগছে! হা হা হা আপনার কবিতা শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছাতে চায়?

মাইদুল

আমি অসম্ভব কিছু করতে চাই। একেবারে অসাধারণ একটা কিছু। আমি সারাদিনই ভাবি, কত অসম্ভব ধরণের কাজ আমি করতে চাই। কিন্তু মানুষ আমার সীমাবদ্ধতা আমাকে প্রতিনিয়তই ঠকায়। আর ঠকতে বলুন কারই বা ভালো লাগে!

জয়

এই যে কারুবাসনা আর বিপন্ন বিস্ময়, যেটা জীবনানন্দের ছিলো। বিনয়ের ছিলো। ওনারা সর্বকালীন কবি। সর্বকালীন হতে কবিকে তাহলে বিপন্ন বিস্ময়ের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হয়? এটা কি এক প্রকার মৃত্যুর ভেতর দিয়ে জন্ম?

মাইদুল

কবিতা রচনাও একটা মানবীয় শ্রম। অন্য যে কোন শ্রমের মতোই এটিও সর্বোচ্চ পরিমাণে মনোযোগ দাবী করে, যদি আপনি নিজেকে শীর্ষে কোথাও নিয়ে যেতে চান। কবি শ্রমিক তার মনের, যেটা পারিপার্শ্বিক অন্য সব মানুষদের পরিচিত অভ্যস্ত জগতের থেকে আলাদা ধরনের কাজ। কবিকে তাই লোকে বুঝতে পারে না, আর না পারার দরুণ তারা কবিদের ঘিরে একরাশ অর্থহীন শব্দের ছড়াছড়ি করে। নিজেকে নিংড়ে সবটুকু রস নিয়ে তবেই কবি তার কর্ম করেন। এটা কেমন অতীন্দ্রিয় ব্যাপার-স্যাপার মনে হয়। কিন্তু আদতে তা অন্য সকল কিছুর মতোই সাধারণ এবং সাধারণ হয়েও অসাধারণ।

জয়

আপনার সঙ্গে আমি একমত। আশি থেকে প্রথম দশকে একজন করে প্রিয় কবির নাম জানতে চাই। তারা কেন প্রিয়?

মাইদুল

কঠিন কাজ, এইজন্যে যে আমি এতে পারদর্শী তো নয়ই, চলনসইও নয়। অর্থ্যাৎ দশকওয়ারী হিসেবটা আমি জানি না। আমি যে কাউকে পড়ি, সে কোন দশকের সেটা সর্ম্পূর্ন না ভেবেই। আমি গ্রামে থাকি, এবং আমি সময় সম্পর্কে সচেতন নই।

জয়

আমাদের সমসমায়িকদের মধ্যে কার কার লেখা ভাল লাগে আপনার, নির্মোহ উত্তর আশা করি।

মাইদুল

এই সচেতনতার ব্যাপারটা অতি উৎসাহের বিপরীতে বললাম। কেননা কে কোন দশকের কবি, এটা অতি উৎসাহী না হলে জানবার দরকার পরে না বলেই আমার মনে হয়। লম্বা হয়ে যাবে। এবং কিছুতেই আমি আঁটসাঁট করতে চাইবো না।

জয়

কোন সমস্যা নেই। লম্বা হোক।

মাইদুল

সায়ন্তন সাহা, হাসান রোবায়েত, ফারাহ্ সাঈদ, শাফীনূর শাফিন, মোস্তফা হামেদী, সামতান রহমান, হাসনাত শোয়েব, রুহুল মাহফুজ জয়, রাতুল রাহা, আসাদ ইকবাল সুমন, খোন্দকার নাহিদ হুসেন, অনুপম মণ্ডল, সুবর্ণা গোস্বামী, শামশাম তাজিল, শারমিন রাহমান এবং আরো অনেকে। সবার নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। আর আমি মনে করি একই সময়ে অবস্থান করে পরস্পরের নাম নেয়াটা কখনোই নির্মোহ হয় না।

জয়

আচ্ছা। আর বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে আপনার কাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়? কেন?

মাইদুল

কিশোর মাহমুদ। তার কবিতাযাপনই সর্বাংশে মনে আসছে। তার ভেতরে একটা আগ্নেয়গিরি আছে এবং সেটা সারাক্ষণই ফুটছে…

জয়

বাংলা কবিতার সাম্প্রতিক কবিতা নিয়া সিনিয়ররা অনেকে ক্ষ্যাপা। এটারে আপনি কতটা ইতিবাচকভাবে দেখেন?

মাইদুল

সিনিয়রদের ক্ষ্যাপা না হইলে চলে! এবং একারণেই সমস্তটা ইতিবাচক।

জয়

কিশোর মাহমুদ তো আমাদের সময়ের কবি। আমি সব সময়ের বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রিয় কবির নাম জানতে চেয়েছি।

মাইদুল

তাহলে বুঝতে ভুল হয়েছিল আমার। বাঙলাদেশের বলতে কি বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পরের কবিদের কথা বলছেন?

জয়

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের আগে-পরে দুভাগেই।

মাইদুল

জীবনানন্দ। এক নিঃশ্বাসে ও এক বিশ্বাসে। এবং তার ব্যাপারে নতুন করে আমার বলবার কিছু নেই।

জয়

পরের বই কবে পড়তে পাবো?

মাইদুল

ঠিক জানি না। কেননা আমি খুব অস্থির।

জয়

এই অস্থিরতার ভেতর দিয়ে কবিতাযাপন চলুক তবে, যদি তা নতুন কবিতা নিয়ে আসে। আপনাকে ধন্যবাদ, মাইদুল। আর আপনি আমার প্রিয় কবিদের একজন।

মাইদুল

ভালোবাসা, রুহুল মাহফুজ জয়। কবিদের জন্য ভালবাসার চেয়ে বড় কোন বালাই নাই।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য