home আলাপচারিতা “আমি খুব বুদ্ধিমান নই। আমি অহংকারীও নই। আমি ঠিক আমার পাঠকদের মতোই একজন।” – হারুকি মুরাকামি ।। অনুবাদ: পৌলমী সরকার

“আমি খুব বুদ্ধিমান নই। আমি অহংকারীও নই। আমি ঠিক আমার পাঠকদের মতোই একজন।” – হারুকি মুরাকামি ।। অনুবাদ: পৌলমী সরকার

হারুকি মুরাকামির জন্ম ‘Kyto’-তে, যেটা জাপানের পূর্ব রাজধানী। তাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে জাতীয় সংস্কৃতির প্রতি ব্যাপক উৎসাহের কমতি ছিলো না। মুরাকামির বাবা ছিলেন জাপানি সাহিত্যের শিক্ষক, পিতামহ বৌদ্ধ-সন্ন্যাসী। দুই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি ‘Kobe’ তে চলে যান। এটি একটি ব্যস্ত পোতশহর- যেখানে সারাবছর বিদেশীদের আনাগোনা লেগেই থাকে (বিশেষত আমেরিকান নাবিকদের)। এই শহর তার অনুভূতিগুলোকে অনেকটাই বাস্তব রূপ দিয়েছিল। জাপানি সাহিত্য, কলা, শিল্পকর্ম ছেড়ে তিনি খুব অল্প বয়সেই জাপানের বাইরের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে শুরু করেন। এমন এক জগৎ যেখানে ছিল জাজসঙ্গীত, হলিউডের সিনেমা আর পুরনো কিছু বইপত্র।

ষাটের দশকের শেষদিকে টোকিওতে ছাত্রজীবন কাটানোর ফলে তার মধ্যে আধুনিক সাহিত্য আর কথাসাহিত্য নিয়ে তার ভেতর ভাল লাগা তৈরী হয়। তিনি ২৩ বছর বয়সে বিয়ে করেন এবং প্রথম উপন্যাস প্রকাশের আগ পর্যন্ত স্ত্রীকে নিয়ে বেশ কয়েক বছর টোকিতে একটি জ্যাজক্লাব চালান। যা তাকে লেখার রসদ যোগাতে সহায়তা করেছে। মুরাকামির ‘Hear The Wind Sung’ উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুদিত হলেও তার বিশেষ অনুরোধে জাপানের বাইরে কোথাও প্রকাশ হয়নি; যদিও এই বইটিই তার পাঠকদের সঙ্গে তাকে পরিচিত করায় এবং তিনি ‘Gunzo Literature Prize’ পান। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত বাস্তবকেন্দ্রিক উপন্যাস ‘The Norwegian Wood’ মুরাকামিকে সাহিত্যজগতের তারকা বানিয়ে দেয়। শুধু জাপানেই বইটি বিক্রি হয় কয়েক মিলিয়ন কপি। টোকিওর প্রতিটি বাড়িতে এটি একটি পরিচিত নাম। তখন থেকেই মুরাকামি তার নিজের দেশে বিখ্যাত নাম হয়ে উঠতে থাকেন। খ্যাতি থেকে দূরে থাকার জন্যে কয়েক বছর তিনি ইউরোপ-আমেরিকাতেও ছিলেন। তিনি ‘The Wind-Up Bird Chronicle’ লিখেছিলেন Princeton ও Tuft এ পড়ানোর সময়। পরে কখনোই তার ‘The Norwegian Wood’ এর সোজাসাপ্টা কায়দায় তিনি আর ফিরে আসেননি। তারপরও প্রতিনিয়ত সারা দুনিয়ায় তার পাঠক বেড়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মুরাকামিই সর্বাধিক পঠিত জাপানি লেখক। নোবেল ছাড়া সাহিত্যের আর প্রায় সকল পুরস্কারই তিনি পেয়েছেন। তিনি একজন সক্রিয় অনুবাদকও। তিনি বেশ কজন অধুনা বিখ্যাত লেখককে অনুবাদের মাধ্যমে জাপানি পাঠকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। হারুকি মুরাকামি কেবল বহুভাষায় অনুদিত একজন বিতর্কিত জাপানি লেখক নন, তিনি তার বইয়ের অসংখ্য বিক্রয়ের মধ্যে দিয়েও পৃথিবীব্যাপি সুখ্যাত। তার সুবিখ্যাত উপন্যাসগুলি কল্পনা ও বাস্তব, রহস্য এবং কল্পবিজ্ঞানের সীমারেখায় অবস্থান করে। তার ‘Hard Boiled Wonderland and the End of World’ এর ক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, এখানে তিনি এক দ্বিমুখী কেন্দ্রীয় চরিত্রের উপস্থাপন করেছেন এবং এই বইটিকে এখনও অব্দি তার শ্রেষ্ঠ রচনা হিসাবে গন্য করা হয়। ‘The Wind-Up Bird Chronicle’ শুরু হয় এক লোকের তার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রীর খোঁজ থেকে – তারপর তা ‘Laurence Stern’ এর ‘Tristan Shandy’ এর এক উৎকৃষ্ট বর্ণনায় প্রবেশ করে। মুরাকামির লেখনি এমন এক রূপকের জগতে থাকে যেখানে যার কিছু চেনা বৈশিষ্ট্য দেখা যায় – একটি শূন্য পাতকুয়ো, একটি পাতালপুরি-কিন্তু সেই সূত্রগুলোর তাৎপর্য পাঠকের কাছে শেষ পর্যন্ত গোপনীয়ই থাকে।

এই সাক্ষাৎকারটি দুটি বিকেল ধরে নেয়া হয়েছে। এ সময়ে তিনি দেখিয়েছেন, তিনি হাস্যরস গ্রহণ ও পরিবেশনে সদাই প্রস্তুত। তিনি ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু যখনই আলোচনায় কোন গম্ভীর বিষয় এসেছে আমি তার ভেতরে একাগ্রতা আর মনোযোগের এক ভীষণ ছায়া দেখেছি। তিনি খুব স্বতঃস্ফূর্ত উত্তর দিয়েছেন। দুটি কথার মধ্যে তার দেয়া স্বল্প বিরতি, ধীরে কথা বলা বোঝায় তিনি কতটা যত্নের সঙ্গে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার চেষ্টা করেছেন। তবে যখনই জ্যাজসঙ্গীত নিয়ে আলোচনা হয়, তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ২২ বছরের এক তরুণ বা ১৫ বছরের এক কিশোর আজও উঁকি মারে।

– Jhon Wray


বি:দ্র: Jhon Wray প্যারিস রিভিউর জন্য এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন ২০০৪ সালে। এরপর দুনিয়ার অনেক কিছুই বদলেছে। মুরাকামির আরো বেশ কিছু বই প্রকাশ পেয়েছে। তিনি আরো জনপ্রিয় হয়েছেন। প্রিয় পাঠক, সাক্ষাৎকারটি পড়ার সময় ২০০৪ সালের আগের হারুকি মুরাকামির সঙ্গেই আড্ডা দিন।


প্রশ্ন: সদ্যই আপনার নতুন গল্প সংকলনটা পড়লাম, ‍“আফটার দ্য কুয়েক‍”, যে ব্যাপারটা খুব ভালো লাগলো বাস্তবতার নিরিখে গল্পগুলিকে এক বুনটে বেঁধেছেন। যেটা “নরওয়েজিয়ান উড” তেও দেখা গেছে। আবার আপনার ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’ বা ‘হার্ড বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যান্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর লেখার ধরন কল্পনাপ্রবণ। প্রাথমিকভাবে আপনি নিজে কি এই দুটি ধরনের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পান?

হারুকি মুরাকামি: আমার ধরন, যেটাকে আমি ভীষণভাবে একদমই নিজস্ব বলে মনে করি সেটা অনেকটা হার্ড বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ডের কাছাকাছি। আমি নিজে বাস্তবঘেঁষা ধরন-ধারন খুব একটা পছন্দ করি না। কাল্পনিক ধরনটাই আমার বিশেষ পছন্দ। তবে ‘নরওয়েজিয়ান উড’ লেখার সময়ে আমি মনস্থির করেছিলাম একটা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবঘেঁষা উপন্যাস লিখবো। সেই বিশেষ অভিজ্ঞতারও আমার দরকার ছিলো।

প্রশ্ন: আপনি উপন্যাসটি শুধুই বিশেষ অভিজ্ঞতা লাভের জন্য লিখেছিলেন, নাকি আপনার গল্পটিই এমন ছিলো যা বাস্তবঘেঁষা পথেই সবথেকে ভাল লেখা সম্ভব ছিলো?

মুরাকামি: আমি যদি শুধুই কাল্পনিক প্লটে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতাম, তাহলেও আমি খ্যাতি পেতাম। কিন্তু আমি সমকালীন গল্প বলার ধরনের সাথেও কিছুটা পরিচিত হতে চাইছিলাম। আমি নিজের কাছে নিজে প্রমাণিত হতে চেয়েছিলাম যে, আমিও ওরকম বাস্তবঘেঁষা লেখা লিখতে পারি। এটা নরওয়েজিয়ান উড লেখার একটা কারণ বলা যায়। বইটা জাপানের বেস্ট সেলার হয়েছিল, এবং আমি এটাই আশা করেছিলাম।

প্রশ্ন: তার মানে, বিষয়টি পরিকল্পিত?

মুরাকামি: একদম! নরওয়েজিয়ান উড পড়ে সহজেই বোঝা যায়। পাঠক সহজেই বইটার ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে। অনেকেই বইটা বেশ পছন্দ করেছেন। অনেকেই আগে থেকেই আমার লেখা অন্যান্য বই পড়েছেন। অনেকে পড়ার ব্যাপারে উৎসাহী হয়েছিলেন। এসব ব্যাপারটাও বেশ সহায়ক হয়েছে।

প্রশ্ন: তার মানে, জাপানি পাঠকরাও আমেরিকার পাঠকদের মতো? তারা সহজ গল্প পড়তে চায়।

মুরাকামি: ‘কাফকা অন দ্য শোর’ আমার এই নতুন বইটি প্রায় তিনশ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। এটা দুটি খণ্ডে। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম যে, বইটি এত ব্যাপক সংখ্যায় মানুষ কিনেছে। জানেন তো, এটা কিন্তু মোটেই সাদামাটা ব্যাপার নয়! গল্পটি পড়ে বোঝার পক্ষে যথেষ্ট জটিল। তবে আমার লেখনীর ধরন পড়ার পক্ষে খুব সহজ। এতে হাস্যরস থাকে, যথেষ্ট নাটুকেও হয় এবং অবশ্যই বেশ আকর্ষক। তবে এই দুই ব্যাপারের মধ্যে বেশ একটা সামঞ্জস্য থাকে, যেটা আমার সাফল্যের অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে সত্যিই, এটা অবিশ্বাস্য রকমের ভালো। আমি প্রতি তিন-চার বছরে একবার উপন্যাস লিখি এবং পাঠকরা তার জন্য অপেক্ষা করে। একবার Jhon Irving-কে আমি ইন্টারভিউ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ভাল বই পড়া মূলত একটি অভ্যাস। একবার যদি পাঠক আসক্ত হয়ে পড়ে, তারা সব সময়ই অপেক্ষা করে।

প্রশ্ন: আপনি আপনার পাঠকদের নেশায় আসক্ত করতে চান?

মুরাকামি: এটাই Jhon Irving বলেছিলেন।

প্রশ্ন: দুটি বিশেষ আঙ্গিক- একটি ঋজু, সহজবোধ্য বর্ণনাত্মক বক্তব্যের সাথে একটু জটিল এবং গোলমেলে চিন্তার মেলবন্ধন—এটা কি স্বেচ্ছা নির্বাচিত?

মুরাকামি: না, সেটা নয়। যখন আমি লিখতে শুরু করেছিলাম, তখন আদতে আমার সেরকম কোন পরিকল্পনাই ছিলো না। আমি কেবল একটি গল্পের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। নরওয়েজিয়ান উড কিছুটা কঠিন হতে পারে। কারণ আমি এই উপন্যাসটা বাস্তবঘেঁষা ঘরানাতেই লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এমনিতে আমি এভাবে বাছতে পারি না।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি কি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এই বাচনভঙ্গি বেছে নেন? এই নির্বিকার, সহজবোধ্য বাচনভঙ্গি? নিজেই বেছে নেন?

মুরাকামি: আমি কিছু ছবি পাই। একটার পর একটা ছবি মনের ভেতর জুড়ি, এটাই একসময় আমার গল্প হয়ে ওঠে। তখন আমি সেই গল্প পাঠকদের বলি। আপনাকে যে কোন গল্প বলার সময়ই যথেষ্ট দরদ দিয়ে বলতে হবে। যদি আপনি ভাবেন তা করবেন না, তাতে আপনার অহমিকা প্রকাশ পাবে। সহজ শব্দ এবং সুন্দর রূপক; উপযুক্ত উপমা — এই-ই থাকে আমার গল্পে। আমি গল্প বলি পরিস্কারভাবে এবং খুব যত্ন নিয়ে।

প্রশ্ন: এটি কি আপনার স্বতঃস্ফূর্ততা?

মুরাকামি: আমি খুব বুদ্ধিমান নই। আমি অহংকারীও নই। আমি ঠিক আমার পাঠকদের মতোই একজন। আমার নিজের একটি ‘Jazz Club’ ও তো ছিলো। সেখানে আমি পানীয়, খাবার বানাতাম। লেখক হবার কোন পরিকল্পনাই আমার ছিলো না। এটা আসলে হয়ে গেছে। এটাকে খানিকটা স্বর্গীয় উপহার বলা যায়। তাই আমার মনে হয়, আমাকে যথেষ্ট বিনয়ী থাকাই উচিত।

প্রশ্ন: কত বছর বয়সে আপনি লেখা শুরু করেন? এটা কি আপনাকে আশ্চর্য করেছিল?

মুরাকামি: যখন আমি ২৯। হ্যাঁ, এটা অবশ্যই একটা আশ্চর্য ঘটনা ছিলো। কিন্তু আমি খুব তাড়াতাড়ি এর (লেখালেখির) সাথে মানিয়ে নিয়েছিলাম।


“আমি মনে করি, আমার কাজ হলো মানুষকে লক্ষ্য করা, এবং পৃথিবীকেই। তাদের বিচার করা নয়। আমি সব সময়ই নিজেকে একটা তথাকথিত উপসংহারের থেকে দূরে রাখি।”


প্রশ্ন: শীঘ্র? তার মানে আপনি প্রথম দিন থেকেই স্বচ্ছন্দ্য ছিলেন?

মুরাকামি: আমি রান্নাঘরের টেবিলে বেশ গভীর রাতে প্রথম লেখা শুরু করি। প্রায় দশ মাস লেগেছিল আমার প্রথম বইটি শেষ করতে। তারপর আমি তা প্রকাশকের কাছে পাঠাই এবং কিছু পুরস্কারও পেয়ে যাই। পুরো ব্যাপারটিই ছিলো স্বপ্নের মতো। আমি যা ঘটতে দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর মনে হয়েছিল, হ্যাঁ এগুলো সত্যিই ঘটছে এবং আমি একজন লেখকরূপে জন্মাচ্ছি; কেমন? এটা এতটাই সরলভাবে ঘটেছিল।

প্রশ্ন: আপনার স্ত্রীর কি প্রতিক্রিয়া ছিল, যখন আপনি লেখা শুরু করেন?

মুরাকামি: তিনি কিছুই বলেননি। এবং যখনই আমি বললাম যে আমি কিছু লিখছি, তিনি বেশ অবাকই হয়েছিলেন। হয়তো অসম্মানিতও।

প্রশ্ন: কেন অসম্মানিত হয়েছিলেন? তিনি কি ভেবেছিলেন আপনি তেমন ভালো লিখতে পারবেন না?

মুরাকামি: আমি আমার শৈশব, এমনকী কৈশোরেও খুব বেশি জাপানি লেখা পড়তাম না। ওই সংস্কৃতিকে আমার একঘেয়ে লাগতো। তা থেকে পালাতে চাইতাম।

প্রশ্ন: সম্প্রতি জাপানের কোন লেখকের বই পড়ে উপভোগ্য মনে হয়েছে কি?

মুরাকামি: হ্যাঁ। বেশ কজনই আছেন। ‘Ryu Murakami’, ‘Banana Yorhimoto’ – উনার বেশ কিছু বই আমার ভাল লেগেছে। তবে আমি কোন সমালোচনামূলক লেখা লিখি না। এর মধ্যে আমি আর নিজেকে ঢোকাতে চাই না।

প্রশ্ন: কেন না?

মুরাকামি: আমি মনে করি, আমার কাজ হলো মানুষকে লক্ষ্য করা, এবং পৃথিবীকেই। তাদের বিচার করা নয়। আমি সব সময়ই নিজেকে একটা তথাকথিত উপসংহারের থেকে দূরে রাখি। সবকিছুকেই পৃথিবীর সমস্ত সম্ভাবনার সামনে বিস্তৃত করে রাখতেই পছন্দ করি। আমি সমালোচনার চেয়ে অনুবাদের কাজকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কারণ অনুবাদের সময়ে আপনাকে কোনকিছুর বিচার করতে হয় না। একটার পর একটা লাইন লিখি, এভাবেই আমি আমার প্রিয় কাজটিকে আমার শরীরে, মনে, প্রবাহিত করি। আমাদের অবশ্যই সমালোচকের প্রয়োজন আছে এই সমাজে, তবে এটি ঠিক আমার কাজ নয়।

প্রশ্ন: আপনার বইয়ের প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। হার্ড বয়েলড আমেরিকান গোয়েন্দাকাহিনীর এক বিরাট সম্পদ। কখন আপনি এই ধারাটির সাথে পরিচিত হলেন আর কেইবা পরিচয়টা করালো?

মুরাকামি: হাইস্কুলে পড়ার সময়েই আমি অপরাধমূলক গল্পের প্রেমে পড়ি। আমি থাকতাম Kobe-এ, যেটা একটা পোত-শহর আর সেখানেই বহু বিদেশী এবং নাবিকরা আসতো তাদের বই বিক্রি করতে, পুরনো বইয়ের দোকানে। আমি তো গরীব ছিলাম। কিন্তু এভাবে সস্তায় অনেক বই কিনেছিলাম। সেই বইগুলো থেকেই আমি প্রথম ইংরেজি পড়তে শিখি। খুব আনন্দের সময় ছিলো সেটা।

প্রশ্ন: আপনার পড়া ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম বই কোনটি?

মুরাকামি: ‘The Name is Archer’, Ross Mcdonald এর লেখা। বইটি থেকে অনেক কিছু শিখেওছিলাম। শুরু করার পর শেষ না করে উঠতে পারিনি। সে সময় আমি তলস্তয় আর দস্তয়ভস্কির লেখা পড়তেও বেশ ভালবাসতাম। সেই বইগুলিও ভীষণ চিত্তাকর্ষক। যদিও গল্পগুলি বেশ বড়, তবুও আমি পড়া শেষ না করে থামাতে পারিনি। তাই আমার কাছে দস্তয়ভস্কি আর রেমন্ড চান্ডলার অনেকটা একই রকমের। এমনকী এখনও কাহিনী বিন্যাসকালে এই দুজনকে একই মলাটে গাঁথার লক্ষ্য থাকে আমার।

প্রশ্ন: কত বছর বয়সে প্রথম আপনি কাফকা পড়েছেন?

মুরাকামি: পনের বছর বয়সে। The Castle টা প্রথমে পড়ি। বইটি খুব ভাল। তারপর পড়ি The Trial.

প্রশ্ন: বেশ অন্যরকম ব্যাপার তো! দুটি উপন্যাসই অসমাপ্ত এবং কোনটিরই আর কখনো ইতি টানা হবে না। আপনার উপন্যাসও তো; বিশেষত আপনার সাম্প্রতিক উপন্যাস The Wind Up Bird Chronicle এ আপনি এমন একটি সমাপ্তি ঘটিয়েছিলেন, পাঠক উপন্যাসটি পড়ার সময় কোনভাবেই আশা করেনি। এটা কি কাফকার প্রভাব, কোনভাবে?

মুরাকামি: পুরোপুরি সেটা নয়। আপনি নিশ্চয় Raymond Chandler এর লেখা পড়েছেন। তার লেখাতেও কিন্তু কোন সম্পূর্ণ পরিসমাপ্তি থাকে না। একবার খুব মজার ঘটনা ঘটেছিল একটা। Howard Hawk একবার The Big Sleep নিয়ে একটা ছবি বানাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না যে Chauffeur কে খুনটা কে করেছিল। তো, তিনি Chandler কে ফোন করেছিলেন খুনির নাম জানার জন্য; আর তখন Chandler উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি জানি না!’ আমার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। পরিসমাপ্তি কিন্তু বেশি কিছু বলে না। আমিও জানি না The Brothers Karamaza এ আসল খুনি কে ছিলেন!

প্রশ্ন: এখনও Chauffeur এর খুনিকে খুঁজে বের করার জন্য The Big Sleep এর পাতা বারবার উল্টে যেতে এত উৎসাহ যোগায়।

মুরাকামি: আমি নিজে, যেহেতু আমি লিখছি, জানি না কে এটা করেছে। আমি এবং পাঠকেরা সেই সময় একই জায়গায় থাকি। যখন আমি কোন একটি গল্প লিখতে শুরু করি, আমি একেবারেই জানি না শেষটা ঠিক কিরকম হবে, এর পরের অংশটাই বা কেমন হবে। যদি প্রথমেই সেখানে কোন খুন হয়, আমি জানি না যে খুনি কে। আমি ঘটনাটি লিখতে থাকি কারণ আমি নিজেও খুনিকে খুঁজে বের করতে চাই। যদি আমি আগে থেকেই খুনি চরিত্রটি জেনে যাই, তাহলে বাকী গল্পটা লেখার কোন মানেই থাকে না।

প্রশ্ন: কোথাও একটা কি ঘটনাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাখ্যা না করার চেষ্টা থাকে? যেমন কোন স্বপ্ন যখন বিশ্লেষণ করা হয়, তখন কি তা সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে?

মুরাকামি: বই লেখার একটি সুন্দর দিক হলো, লেখাকালীন সময়ে আপনি জেগে থেকেও স্বপ্ন দেখতে পারেন। যদি এটি সত্যিকারের স্বপ্ন হতো, সেটাকে আপনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতেন না। লেখা চলাকালীন, আপনি জেগে আছেন, আপনি তখন স্বপ্নের সময় বা দৈর্ঘ্য ইচ্ছেমত পছন্দ করতে পারেন। আমি সকালে চার-পাঁচ ঘণ্টা লিখি এবং নিদিষ্ট সময় শেষ হয়ে এলে আমি সেদিনের মতো শেষ করি। আবার পরেরদিন শুরু করি। যদি এটা সত্যি স্বপ্ন হতো, আপনি তা করতে পারতেন না।

প্রশ্ন: আপনি বললেন যে, যখন লিখেন তখনও আপনি জানেন না খুনি চরিত্রটা কে। তবে আমার একটা ব্যতিক্রমি ঘটনা মনে পড়ছে: ‘Dance Dance Dance’ এ ‘Gotanda’ চরিত্রটি। চরিত্রটি নির্মাণের সময় থেকে তার অপরাধ স্বীকার করার মুহূর্ত অব্দি – কোথাও একটা ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে অপরাধী সাজানোর চেষ্টা ছিল। তার অপরাধে বা উপন্যাসের বিন্যাসেও তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন তাকেই অপরাধী বলে সন্দেহ হয়। আপনি কি আগে থেকেই তাকে অপরাধী হিসাবে নির্বাচিত করেননি?

মুরাকামি: আমি আমার আশেপাশের মানুষদের লক্ষ্য করে লেখার চরিত্রদের নির্মাণ করে থাকি। নিজে বেশি কথা বলতে ভালবাসি না, বরং অন্যের গল্প শুনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। তারা কি ধরণের মানুষ তা আমি স্থির করি না। বরং একটু ভাবার চেষ্টা করি, তারা কি ভাবছেন, কোথায় চলেছেন। এভাবেই টুকরো টুকরো দেখা আর অভিজ্ঞতা থেকে রসদ সংগ্রহ করে নেই। আমি বুঝি না যে সেগুলো কতটা বাস্তবসম্মত বা কাল্পনিক, কিন্তু আমার কাছে আমারই সৃষ্ট চরিত্ররা অনেক বেশি খাঁটি – আসল মানুষদের থেকেও। যে ছয়-সাত মাস আমি লিখি, সেসব চরিত্র আমার মধ্যেই থাকে। এটা খানিকটা মহাজাগতিক আকার ধারণ করে।

প্রশ্ন: আপনার কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলি যেন আপনারই দৃষ্টিভঙ্গিকে আপনার লেখার  এক অনন্য জগতে প্রতিফলিত করে। তারা স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন দেখে।

মুরাকামি: এভাবে বিষয় ভাবলে বুঝতে পারবেন : আমার একটি যমজ ভাই আছে। এবং দু বছর বয়সে আমাদের মধ্যে একজন, অন্যজন আর কি, অপহৃত হলো। তাকে বহুদূরে এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং আজ পর্যন্ত আমরা একে অপরকে আর দেখিনি। আমার কেন্দ্রীয় চরিত্রটিকে আমি তাই-ই ভাবি। যে আমারই একটা অংশ কিন্তু আমি নই এবং তাকে আমি বহুদিনই দেখিনি। এটি খানিকটা আমারই পরিপূরক অংশ। ডিএনএ-এর ভিত্তিতে আমরা এক, কিন্তু আমাদের পরিবেশ-পরিস্থিতি আলাদা। সুতরাং আমাদের ভাবনা-চিন্তার পদ্ধতিও আলাদা। যখনই আমি নতুন বই লিখি, নতুন কিছু ভাবার চেষ্টায় থাকি। কারণ কখনো কখনো আমি আমার আমিত্বে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এভাবে কখনো কখনো সেই ক্লান্তি ভোলার চেষ্টা করি। এটা একটা কল্পনার জগৎ। আমার মধ্যে যদি কল্পনাই না থাকলো, তাহলে লেখার আর তাৎপর্য কি!

প্রশ্ন: একটি লেখার মোটামুটি কতগুলি খসড়া করেন?

মুরাকামি: চার থেকে পাঁচটি। ছয় মাস ধরে প্রথম খসড়াটি তৈরি করি। পরবর্তী খসড়াগুলোর জন্য আরো সাত থেকে আট মাস সময় নিই।

প্রশ্ন: যথেষ্ট তাড়াতাড়িই!

মুরাকামি: আমি পরিশ্রমী। আমার কাজে ভীষণভাবেই মনোঃসংযোগ করি। তাই এটা সহজ হয়ে যায় এভাবে, জানেন। বাস্তবিকই সহজ এটা। কারণ আমি যখন লিখি, তখন লেখা ছাড়া আর কিছুই করি না।


“আগেরবারের কায়দাটিকে ভেঙে ফেলে নতুন কিছু করতে চাই। গঠণশৈলীর ব্যাপারে আমি সবসবময়ই বিশেষ চিন্তিত থাকি।”


প্রশ্ন: আপনার প্রাত্যহিক কাজগুলি সাধারণত কি রকম?

মুরাকামি: যখন উপন্যাস লিখি, ভোর চারটেয় উঠে টানা পাঁচ থেকে ছয়ঘণ্টা লিখি। বিকেলে ১০ কিলোমিটার দৌড়াই বা ১৫শ মিটার সাঁতরাই (অথবা দুটোই করি)। তারপর কিছু পড়াশোনা করি আর গান শুনি। রাত ৯টায় শুতে যাই। ঠিক এই কাজগুলিই আমি প্রত্যেকদিন করি। কোন বদল হয় না। ক্রমান্বয়ে একইভাবে চলতে থাকা জীবন কখনো নিজেই একটি মুগ্ধতা হয়ে যায়। নিজেকে মনের গভীরে পৌঁছানোর জন্য আবিষ্ট হই। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে এই একই কাজ একটানা করে যাওয়া, তা বছরে ছয়মাস হলেও – এর জন্য যথেষ্ট মানসিক ও শারীরিক দৃঢ়তার প্রয়োজন। সেদিক থেকে, উপন্যাস লেখা দস্তুর মতো বেঁচে থাকার এক প্রশিক্ষণ বলা যায়। নান্দনিক অনুভবগুলোর সাথে শারীরিক দৃঢ়তারও যেখানে খুব প্রয়োজন।

প্রশ্ন: Hard Boiled Wonderland নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন।বইটির সামঞ্জস্য আর ঋজুতা আপনার অন্য বইগুলো থেকে এটিকে আলাদা করেছে।উপন্যাসটিতে কি কোথাও আপনার বক্তব্য প্রকাশের ধরন বা কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছিল?

মুরাকামি: হ্যাঁ। আমার প্রথম দুটি বই জাপানের বাইরে প্রকাশ পায়নি।আমিই চাইনি প্রকাশ করতে। সেগুলোকে আসলে আমার অপরিণত কাজ মনে করেছিলাম। বইগুলিও খুব সংক্ষিপ্ত। সঠিক ভাষায় বলতে গেলে আমার নগন্য কাজ।

প্রশ্ন: সেগুলির খুঁত কি কি ছিলো বলে মনে করেন?

মুরাকামি: আমার প্রথম দুটি কাজে আমি জাপানি সাহিত্যের গঠন-কাঠামোকে ভেঙে ফেলে নতুনভাবে সাজাতে চেয়েছিলাম। মানে গঠনশৈলীটি মূল কাঠামো বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে চেয়েছিলাম।তারপর আমি সম্পূর্ণ নতুন কিছু দিয়ে আরেকটা কাঠামো তৈরি করি। কিন্তু তখন এ ব্যাপারে অনভিজ্ঞ ছিলাম। সঠিক পন্থাটি আমি চিনতে পারি আমার তৃতীয় বইয়ের পরে, “A Wlid Sheep Chare (1982)” এ। বলা যায়, প্রথম দুটি বইয়ে আমার হাতেখড়ি হয়েছিল। তার বেশিকিছু নয়। A Wlid Sheep Chare (1982) কেই আমি আমার নিজস্ব ঘরানার প্রথম কাজ বলে মনে করি। তারপর থেকেই আমার বই পরিণত হতে শুরু করে এবং গঠণকাঠামো আলাদা হয়। প্রতিবারই যখন লিখতে শুরু করি, আগেরবারের কায়দাটিকে ভেঙে ফেলে নতুন কিছু করতে চাই। গঠণশৈলীর ব্যাপারে আমি সবসবময়ই বিশেষ চিন্তিত থাকি। যদি গঠণ বদলাতে হয়, তাদের আমার তাদের আমার কাহিনীবিন্যাসের কায়দা আর চরিত্রগুলিকেও ক্রমান্বয়ে বদলাতে হয়। যদি তা না করে চিরাচরিত প্রথাই অবলম্বন করি, বারবার একই ফর্ম আমাকে ক্লান্ত করে তুলবে।

প্রশ্ন: আপনার লেখায় যেন ঠিক দুই ধরণের নারী চরিত্র থাকে; যাদের সাথে কেন্দ্রীয় চরিত্রটির প্রাথমিকভাবে বেশ দৃঢ় সম্পর্ক থাকে – প্রায়ই সেই নারী তারপর হারিয়ে যান এবং তার স্মৃতি তাকে কেবল তাড়া করে বেড়ায় – আরেক ধরনের নারী চরিত্র যারা তারপরে কেন্দ্রীয় চরিত্রটির জীবনে আসে এবং হয় তার গন্তব্যের দিশা দেখায় অথবা স্মৃতি থেকে সেই প্রথম নারীকে মুছে দেয়। এই দ্বিতীয় নারীটিকে দেখা যায় অনেক সহজভাবে, যৌনতা সংক্রান্ত বিষয়েও যে অনেটা মুক্তমনা এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রটিকেও তার সাথে বেশ উষ্ণ আলাপ করতে দেখা যায় – যা সে প্রথম নারীর সাথে করতো না, এমনকী তার সাথে বিশেষ হৃদ্যতাও ছিলো না। এই ধরনটির কি বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে কোনো?

মুরাকামি: আমার কেন্দ্রীয় চরিত্রটি সব সময়ই বাস্তব জগৎ আর আধ্যাত্মিক জগতের এক সীমারেখায় বিচরণ করে। আধ্যাত্মিক জগতে নারী, পুরুষ সকলেই শান্ত, বুদ্ধিমান, বিনয়ী, জ্ঞানী। কিন্তু বাস্তবের নারীরা অনেক বেশি সক্রিয়, চতুর। তাদের যথেষ্ট হাস্যরস আছে। এখানেই কেন্দ্রীয় চরিত্রটির মন দু’ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে এবং সে ঠিক বুঝতে পারে না কোন্ জগৎটি তার জন্য সঠিক। আমি মনে করি এটিই আমার লেখার মূল বৈশিষ্ট্য। এটা Hard Boiled Wonderland এ বেশি করে প্রকাশ পায়। সেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রটি মানসিকভাবে বিভক্ত হয়ে যায়। Norwegian Wood এও তাই। সেখানেও দুটি নারী চরিত্রের মধ্যে সে কোনভাবে একজনকে বেছে নিতে পারে না – গল্পের প্রথম থেকে শেষ অব্দি।

প্রশ্ন: হাস্যরস সম্পন্ন নারীটিকেই ব্যক্তিগতভাবে আমার বেশি পছন্দ হয়। হাস্যরসের মাধ্যমে পাঠকের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা, কিন্তু ভালবাসার বিবিধ বর্ণনার মাধ্যমে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। Norwegian Wood এ আমি তাই সব সময় Midori-কেই খুঁজেছি।

মুরাকামি: বেশিরভাগ পাঠকই একই কথা বলবেন। বেশিরভাগই Midori-কেই বেশি পছন্দ করবেন। এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রটি অবশ্যই শেষ পর্যন্ত তাকেই বেছে নেয়। কিন্তু ওর আরেকটি সত্তা যেন অন্য কোন একটি জগতেই থেকে যায়। সে কিছুতেই তা আটকাতে পারে না। এটি তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি মানুষেরই কিছু মানসিক দুর্বলতা থাকে। সেই দুর্বলতাও তাদেরই একটা অংশ। আমাদের দুটি সত্তা আছে – প্রকৃতস্থ এবং অপ্রকৃতস্থ। আমরা দুটি সত্তার সাথে অনেক কথা বলি। এটা আমার বিশ্বাস। আমি যখন লিখি, বিশেষত তখনই আমি আমার অপ্রকৃতস্থ সত্তাটির দেখা পাই। ‘অপ্রকৃতস্থ’ শব্দটি অবশ্য বলা ঠিক নয়। অসাধারণ বা অবাস্তব বললে মনে হয় ভালো। যদি একসময় আমাকে বাস্তবে ফিরে যেতে হয়, বাস্তব সত্ত্বাটি আবার জেগে ওঠে। কিন্তু ওই অবাস্তব সত্তাটি যদি আমার না থাকতো, তাহলে আজ আমি এখানে আসতে পারতাম না। অন্যদিকে, আমার কেন্দ্রীয় চরিত্রটি দু’জন নারীর দ্বারা অনুপ্রাণিত। তাই একজনকে ছাড়াও সে এগোতে পারে না। সেক্ষেত্রে Norwegian Wood একটি সঠিক উদাহরণ।

প্রশ্ন: Norwegian Wood এর Reiko চরিত্রটি সেদিক থেকে খুব আকর্ষণীয়। কিন্তু তাকে ঠিক কোন জগতের বাসিন্দা বলা যায়? সে যেন উভয় জগতেই বিচরণ করে।

মুরাকামি: সে অর্ধ সচেতন এবং অসচেতন অবস্থায় থাকে। এটি একটি গ্রিক মুখোশ। একদিক থেকে দেখলে তার চরিত্রটি দুঃখের, অন্যদিক দিয়ে দেখলে মনে হয় সে হাস্যরসের অধিকারী। সে কিন্তু প্রতীকী। আমার ওর চরিত্রটা খুব ভালো লাগে। যখন আমি লিখছিলাম, তখনই আমার বেশ ভাল লেগেছিল তাকে; Reiko-San.

প্রশ্ন: আপনার বইয়ের অনুবাদের বিষয়ে জানতে চাইবো। নিজে একজন অনুবাদক হিসাবে, অনুবাদের সমস্যাগুলোর সাথে তো আপনি পরিচিত। আপনি কোন্ কোন্ বিষয়ের ভিত্তিতে আপনার বইয়ের অনুবাদক নির্বাচন করেন?

মুরাকামি: আমি তিনজন অনুবাদককে পছন্দ করি: Alfred Birnbaum, Philip Gabriel, Jay Rubin. এক্ষেত্রে আমার নীতি হলো ‘যিনি আগে আসবেন তিনি অগ্রাধিকার পাবেন। আমরা বন্ধুস্থানীয়। সুতরাং এ ব্যাপারে প্রত্যেকেই সৎ থাকি। তারা আমার বই পড়েন এবং তাদের মধ্যে একজনের সেটিকে খুবই ভালো লাগে। তিনি কাজটি করতে চান। সুতরাং তিনিই সেবার দায়িত্বটি নেন। নিজে একজন অনুবাদক হিসাবে আমি জানি, কোন বিষয়ের অনুবাদ ভাল হওয়ার মূল কারণ হলো বিষয়টি নিয়ে উৎসাহ। যে বিষয়টি অনুবাদ করতে যাচ্ছেন, খুব ভাল অনুবাদকেরও সেই বিষয়টি নিয়ে যদি বিশেষ উৎসাহ না থাকে, তাহলে গল্প সেখানেই শেষ হয়ে যায়। অনুবাদ একটি পরিশ্রমের কাজ এবং এটি সময়সাপেক্ষও।

প্রশ্ন: অনুবাদকদের মধ্যে মনোমালিন্য হয় না?

মুরাকামি: সেরকম নয়। তাদের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ আছে। তারা প্রত্যেকেই ভিন্ন চরিত্রের ভিন্ন মানুষ। ‘Kafka on the Shore’ টি Phil এর খুব পছন্দ হয়েছিল। তিনিই সেই বইয়ের অনুবাদ করেছিলেন। Jay এর বিশেষ ভাল লাগেনি। Phil খুব নম্র ও ভদ্র স্বভাবের একজন মানুষ। Jay খুবই সতর্ক, যত্নবান ও যথার্থ একজন অনুবাদ। তিনি একটু বেশি দৃঢ়তাসম্পন্ন মানুষ। Alfred একটু বাউন্ডুলে স্বভাবের আর কি। আমি জানিও না এখন ও কোথায়। ও মিয়ানমারের এক নারীকে বিয়ে করেছিল। তিনি সক্রিয় একজন বিপ্লবী। মাঝেমাঝেই প্রশাসন তাদের গ্রেফতারও করেন। ও এরকমই একজন মানুষ। সে এক স্বাধীন অনুবাদক। অনুবাদ করলে কাহিনীতে সেও কিছু পরিবর্তন করে – মাঝেমাঝেই। এটাই তার কায়দা।

প্রশ্ন: অনুবাদকদের সাথে ঠিক কিভাবে কাজ করেন? কাজের অগ্রগতি, কায়দাগুলি যদি একটু বলেন?

মুরাকামি: তারা অনুবাদ করার সময়ে আমাকে অনেক প্রশ্ন করেন। তারপর প্রথম খসড়াটি হলে, আমি সেটা পড়ি। কখনো কখনো কিছু পরামর্শ দেই। ইংরেজি ভাষায় আমার লেখার অনুবাদটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ছোট দেশে যেমন – ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া ইংরেজি অনুবাদ থেকেই ওরা ওদের ভাষায় আমার বইয়ের অনুবাদ করে; জাপানি থেকে পারে না। সুতরাং ইংরেজিতে সঠিক ও যথাযথ অনুবাদ হওয়া খুব প্রয়োজন। তবে অন্যান্য বেশিরভাগ দেশেই মূল জাপানি থেকে অনুদিত হয়।

প্রশ্ন: আপনি নিজে বাস্তববাদীদের যেমন: Carver, Fitzgerald, Irving প্রমুখের লেখাই অনুবাদ করতে পছন্দ করেন। এতে কি পাঠক হিসাবে আপনার রুচির প্রকাশ ঘটে? অথবা এটি কি কোনভাবে নতুন কিছু বিষয়েও লেখালেখি করতে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করে?

মুরাকামি: আমি তাদের বই-ই অনুবাদ করি, যাদের কাছ থেকে আমি কিছু শিখতে পারবো। এটিই প্রধান বিষয়। আমি এই বাস্তববাদী লেখকদের লেখা থেকে অনেক কিছুই শিখি। তাদের লেখা অনুবাদের জন্য নিবিড়ভাবে, নিপুণভাবে পড়া দরকার। এভাবে পড়তে গিয়ে তাদের কিছু না বলা কথাও যেন খুঁজে পাই। যদি আমি আধুনিক যুগের শেষের দিকের লেখক যেমন: Don Deliuo, Jhon Barth বা Thomas Pynchon প্রমুখের লেখা অনুবাদ করতাম, তাহলে তাদের অবাস্তব কল্পনার সাথে আমার কল্পনার বারেবারে সংঘাত হতো। তাদের লেখা আমি খুব পছন্দ করি যদিও, কিন্তু যখন অনুবাদ করি, আমি বাস্তববাদীদের বেছে নেই। যেখানে আমার কল্পশক্তির কোনরূপ আঘাত লাগে না।

প্রশ্ন: আপনার লেখাকে তো আমেরিকান পাঠকদের কাছে জাপানি সাহিত্যের সবথেকে বেশি সহজবোধ্য মনে করা হয়। কারণ আপনি নিজেই লেখক হিসাবে অন্যান্য জাপানি লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাশ্চাত্যঘেঁষা। আপনার সাথে জাপানি সংস্কৃতির কিরকম সম্পর্ক হতে পারে, তাই ভাবছিলাম।

মুরাকামি: আমি বিদেশে বসে বিদেশীদের নিয়ে লিখতে চাই না। আমি আমাদের নিয়ে লিখতে চাই। জাপানকে নিয়ে, জাপানের মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে লিখতে চাই। অনেকে বলেন যে আমার লেখার ধরনটি বিদেশী ছাঁচে ঢালা; হতে পারে সত্যিই তাই, তবে আমার গল্পগুলি কিন্তু আমারই – একদম নিজস্ব, তাদের কোন পাশ্চাত্যকরণ হয় না।

প্রশ্ন: অনেক ক্ষেত্রে আমেরিকানরা আপনার গল্পে পাশ্চাত্যের কিছু সূত্র বা মিল খুঁজে পান। যেমন ধরুন The Beatles জাপানের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে।

মুরাকামি: যখন আমি লিখি আমার যে কোন একটি চরিত্র McDonalds এর হ্যামবার্গার খাচ্ছে, আমেরিকানরা অবাক হন যে আমার চরিত্রটি Tofu না খেয়ে Hamburger কেন খাচ্ছে? কিন্তু আমাদের কাছে Hamburger একটি খুব সাধারণ বিষয়। এটিকে প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনাই বলা যায়।

প্রশ্ন: তার মানে আপনি কি বলতে চান যে আপনার লেখায় সমকালীন জাপানের শহুরে সংস্কৃতির ছাপ পাওয়া যায়?

মুরাকামি: যেভাবে আমার চরিত্রেরা কথা বলে, ভাবনা-চিন্তা বা কোন কাজ-কর্ম করে, তা সম্পূর্ণই জাপানি কায়দায়। কোন জাপানি পাঠক, প্রায় কোন জাপানি পাঠকই এটা বলতে পারবে না যে তা আমাদের জীবনযাত্রা থেকে আলাদা কিছু তুলে ধরে। আমি জাপানিদের নিয়েই লেখার চেষ্টা করি। আমি লেখার চেষ্টা করি আমরা কি, কোথায় যাই, কেনই বা যাই ইত্যাদি। এটিকেই আমার লেখার মূল বিষয়বস্তু মনে করি।


“আজকাল লেখার কাজে বর্ণনার একটা বড় ভূমিকা থাকে। আমি তত্ত্বকথায় বিশেষ বিশ্বাসী নই, শব্দের ব্যবহার নিয়েও নই। আমার কাছে যেটা সব থেকে গুরুত্ব পায় তা হলো বর্ণনাটি যথাযথ কীনা।”


প্রশ্ন: আপনি আগে একবার ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রোনিকল’ এর কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আপনি আপনার বাবাকে নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহী। ওনার এবং ওনার পুরো প্রজন্মের সাথেই যা যা ঘটেছে – কিন্তু আপনার গল্পে কোন ‘পিতৃ চরিত্র’ নেই, সত্যি কথা বলতে আপনার কোন গল্পেই থাকে না। তাহলে আগ্রহটা কি সাময়িক?

মুরাকামি: আমার প্রায় সব উপন্যাসই প্রথম পুরুষে লেখা। আমার কেন্দ্রীয় চরিত্রটির প্রধান কাজ হলো তার চারপাশে ঘটা প্রতিটা জিনিস লক্ষ্য করা। যা তার দেখা উচিত বা যা তার দেখলে ভাল হয় – তার সবই সে সঠিক সময়ে লক্ষ্য করে। যদি আমি এভাবে বলি তাহলে সে ‘The Great Gatsby’ এর ‘Nick Carraway’ – এর কথা মনে করাবে। সে নিরপেক্ষ এবং তার এই নিরপেক্ষতা পালনের জন্য তাকে অবশ্যই যে কোন প্রকার আত্নীয়তা সম্পর্ক বা পারিবারিক বন্ধনের ঊর্ধ্বে বিরাজ করতে হবে।

আমার এই কথা প্রসঙ্গে আসতে পারে যে পরিবার সব সময়ই জাপানি সাহিত্যের বেশ একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। আমি আমার প্রধান চরিত্রকে একজন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং একান্ত স্বতন্ত্র এক ব্যক্তিত্বরূপে দেখতে চেয়েছি। একজন শহুরে বাসিন্দা হিসাবেও এক্ষেত্রে তার কিছু ভূমিকা থাকে। সে এমন একজন মানুষ যে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিনিময়ে স্বাধীনতা এবং একাকীত্ব খোঁজে।

প্রশ্ন: আপনার শেষ গল্প সংকলনের ‘সুপার ফ্রগ সেইভস টোকিও’-টা যখন পড়ছিলাম, যেখানে এক দানবীয় পোকা টোকিও শহরের নিচ থেকে সবকিছু ধ্বংস করে দেবার ভয় দেখাচ্ছিলো, তখন আমি ‘মাঙ্গা’ বা পুরনো দিনের জাপানি রাক্ষসের সিনেমার কথাই ভাবছিলাম মনে মনে। তারপর একটা রাক্ষুসে মাছকে নিয়ে যে পৌরানিক গল্প আছে যেখানে মাছটি টোকিও উপসাগরের ধারে ঘুমিয়ে থাকে এবং প্রতি পঞ্চাশ বছরে একবার ঘুম ভেঙে ভূমিকম্প ঘটায় এদের মধ্যে থেকেই কি আপনার গল্পের ভাবনা এসেছিল?

মুরাকামি: আমি তা মনে করি না। আমি মাঙ্গা কমিকসের খুব একটা ভক্ত ছিলাম না। তাই এদের থেকে কোনভাবেই অনুপ্রাণিত নই আমি।

প্রশ্ন: জাপানি রূপকথা সম্পর্কে কিছু বলুন।

মুরাকামি: যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন আমাকে অনেক জাপানি রূপকথা আর পুরনো দিনের গল্প শোনানো হতো। সেই গল্পগুলিই বড় হয়ে জটিল হয়ে যায়। সেই দানব ব্যাঙটির ভাবনা হয়তো আমার মনে এসেছিল সেরকমই কোন গল্পের স্রোত থেকে যেগুলোর সাথে শৈশবে আমার পরিচয় ছিলো। আপনাদের যেমন আমেরিকান লোককথার সম্ভার আছে, জার্মানদের আছে, রাশানদের আছে। তবে কোথাও একটা আমাদের সবারই পারস্পরিক লোকগাথা তৈরি হয় যা মূলত ‘দ্য লিটল প্রিন্স’, ‘ম্যাকডোনাল্ডস’ অথবা ‘দ্য বিটলস’-কে ঘিরে।

প্রশ্ন: বর্তমান লোকগাথা?

মুরাকামি: আজকাল লেখার কাজে বর্ণনার একটা বড় ভূমিকা থাকে। আমি তত্ত্বকথায় বিশেষ বিশ্বাসী নই, শব্দের ব্যবহার নিয়েও নই। আমার কাছে যেটা সব থেকে গুরুত্ব পায় তা হলো বর্ণনাটি যথাযথ কীনা। ইন্টারনেটের বদৌলতে এখন আমাদের লোকগাথার ধরণটাই পাল্টে গেছে। এটি রূপকাশ্রয়ী। ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ ছবিটি আমি দেখেছিলাম – এটি সমসাময়িক সময়ের লোকগাথা। তবে সবাই এখানে ছবিটিকে একঘেয়ে মনে করেছে।

প্রশ্ন: হায়ায়ো মিয়াজাকির কমিক্যাল মুভি ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’ দেখেছেন? আমি আপনার বইয়ের সাথে অনেক মিল পেয়েছি। সেখানে তিনিও লোকগাথাকে সমসাময়িকতার আঙ্গিকে নতুন মোড়কে পরিবেশন করেছেন দর্শকের সামনে। ছবিটি আপনার কেমন লেগেছে?

মুরাকামি: না। কার্টুন ছবি আমি বিশেষ একটা পছন্দ করি না। কেবল একটুখানি দেখেছিলাম ছবিটির, তবে এরকম ছবি আমার ভাল লাগে না। এই বিষয়গুলোতেও আমি একেবারেই আগ্রহী নই। যখন আমি লিখি, তখন যে ছবি আমি লেখার জন্য পাই তা যথেষ্টই সুগঠিত।

প্রশ্ন: আপনি প্রায়ই কি সিনেমা দেখতে যান?

মুরাকামি: অবশ্যই। প্রায়ই। ফিনল্যান্ডের একজন পরিচালক ‘Aki Kaurismäki’ এর কাজ ভীষণ প্রিয়। ওনার ছবির প্রত্যেককেই খুব ভালো লাগে।


“আমার গল্প অনেক বাস্তবঘেঁষা, সমসাময়িক এবং আধুনিকোত্তর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। এটিকে যাত্রাপালার মঞ্চসজ্জার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে সমস্ত পোশাক-পরিচ্ছেদ, দেয়ালে রাখা বই, আলমারি, সবই সাজানো; সবই মিথ্যা।”


প্রশ্ন: আপনি আগে বলেছিলেন যে, হাস্যরস অপরিবর্তনীয়। অন্যভাবেও কি এটি উপকারী?

মুরাকামি: আমি আমার পাঠকদের কখনো কখনো হাসাতেও চাই। জাপানের অনেক পাঠকই আমার লেখা ট্রেনে যেতে যেতেও পড়েন। সেজন্যই আমি বড় উপন্যাসগুলিকে দুটি খণ্ডে প্রকাশ করি। একটি খণ্ডে প্রকাশ পেলে ওই পাঠকদের জন্য তা যথেষ্টই ভারী হয়ে যেতো। অনেকে আমাকে চিঠি লেখেন। বলেন যে ট্রেনে তারা আমার বই পড়ে ট্রেনেই হেসে ফেলেন! তাদের জন্য সেটা অসম্মানজনক। এই চিঠিগুলিই আমি বেশি পছন্দ করি। আমি জানি যে তারা আমার বই পড়ে হাসেন। এটা ভালো ব্যাপার। আমি প্রতি দশপাতা পরেই আমার পাঠকদের হাসাতে চাই।

প্রশ্ন: এটিকে কি আপনার গোপন রহস্য বলা যায়?

মুরাকামি: সেভাবে কখনো হিসাব করি না। কিন্তু যদি সেভাবে ভাবতে পারতাম, তাহলে মন্দ হতো না। যখন কলেজে পড়তাম, তখন Kurt Vonnegut এবং Richard Brautigan এর লেখা পড়তে ভালবাসতাম। তাদের লেখায় হাস্যরস থাকতো। আবার তাদের লেখার বিষয়বস্তু ছিলো রাশভারী। আমি এই ধরণের বই পড়তে বেশি ভালবাসি। প্রথম যখন Vonnegut এবং Brautigan এর লেখা পড়ি, তখন রীতিমতো বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম! তিনটি বই-ই এমন ছিলো। অনেকটা নতুন এক জগৎ আবিষ্কারের অনুভূতি।

প্রশ্ন: আপনি কখনো এরকম লেখা লেখার জন্য উদ্ধুদ্ধ হননি?

মুরাকামি: আমি মনে করি এই জগৎটা নিজেই একটা হাস্যরসের উৎস। বিশেষ করে এই শহুরে জীবন। ৫০টি টিভি চ্যানেল আর সরকারী স্তরে হাস্যকর কিছু ব্যক্তিত্ব – সবটাই হাস্যকর। আমি গম্ভীরভাবে বিষয়টি গ্রহণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু যত বেশি গম্ভীরভাবে বিষয়টা ভাবার চেষ্টা করি, তত বেশি হাসি পায়। আমরা ১৯৬৮-৬৯ এই সময়ে খুব গম্ভীর থাকতাম। তখন আমার ১৯ বছর বয়স। সময়টাও বেশ গম্ভীর, রাশভারী ছিলো যেন – সবাই ছিলেন খুব আদর্শবাদী।

প্রশ্ন: আপনার নরওয়েজিয়ান উড বইটিও সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা এবং সব বইয়ের মধ্যে ওটাইতেই সম্ভবত সবচেয়ে কম হাস্যরসের উপস্থিতি। ঠিক কীনা?

মুরাকামি: সেভাবে দেখতে গেলে বলা যায় যে, আমাদের প্রজন্মটাই ছিলো গম্ভীর, রাশভারী। কিন্তু সেই দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকালে মনে হয় কী ছেলেমানুষি ছিলো তখন! এক অস্থির সময়। আমরা, আমাদের প্রজন্ম তাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি বলে আমার মনে হয়।

প্রশ্ন: কল্পবাস্তবতার একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কল্পিত মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে গুরুত্ব না দেয়া। কিন্তু আপনি আপনার লেখায় প্রায়ই সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসেন। আপনার চরিত্ররা প্রায়ই অবাস্তব কল্পনার সীমারেখায় দাঁড়িয়ে কথা বলে। এর পেছনে কি বিশেষ কোন পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য থাকে?

মুরাকামি: এটি বেশ মজার প্রশ্ন। এ্ই ব্যাপারটি নিয়ে ভাবতে আমার ভাল লাগে। আসলে এটা আমার খুব সৎ পর্যবেক্ষণ যে এই পৃথিবী কতটা আশ্চর্যের। লেখা চলাকালীন সময়ে আমি যতরকম অভিজ্ঞতা লাভ করি, আমার কেন্দ্রীয় চরিত্ররাও তাই করে। যখন পাঠকরা সেটি পড়েন, তাদের মধ্যেও সেই অভিজ্ঞতা সঞ্চারিত হয়। কাফকা বা গার্সিয়া মার্কেজ – তারাও যা লেখেন তার মধ্যে সাহিত্যরস অনেক বেশি থাকে। আমার গল্প অনেক বাস্তবঘেঁষা, সমসাময়িক এবং আধুনিকোত্তর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। এটিকে যাত্রাপালার মঞ্চসজ্জার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে সমস্ত পোশাক-পরিচ্ছেদ, দেয়ালে রাখা বই, আলমারি, সবই সাজানো; সবই মিথ্যা। সেখানে আছে কেবল কাগজের দেয়াল। প্রথাগত বাস্তবতায় কিন্তু এই দেয়াল, বই এই সবই সত্যিকারের হতো। যদি আমার গল্পে কিছু সাজানো বা মিথ্যা হয়, আমি তাদেরকে মিথ্যা বলতেই পছন্দ করি, সত্যিকার নাটকে মুড়ে রাখতে চাই না।

প্রশ্ন: আপনার যাত্রাপালা, রঙ্গমঞ্চের উদাহরণ ধরেই বলি, ক্যামেরা কি স্টুডিওর কর্মপদ্ধতি নির্দেশ করে?

মুরাকামি: আমি দর্শকদের সামনে সবকিছুকেই সত্য বলে তুলে ধরতে চাই না। যেটি যেমন সেটিকে তেমনভাবেই উপস্থাপন করতে চাই। তাই আমি পাঠকদের বুঝিয়েই দেই এটি কেবল একটি গল্প – মিথ্যা ঘটনা। কিন্তু যখন আপনার কোন এক মিথ্যা ঘটনাকেও সত্য বলে মনে হবে, তখন তা সত্য হলেও হতে পারে! তখন সেই ব্যাপারটিকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে না।

ঊনবিংশ এবং বিংশ শতকের প্রথমার্ধে লেখকরা সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখতেন। যেমন তলস্তয় তার ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এ যুদ্ধক্ষেত্রটিকে এত কাছ থেকে, এত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে পাঠকরা ভাববে এটা সত্যি ঘটনা। কিন্তু আমি তা করি না। আমি কখনোই গল্পকে সত্যি বলে দেখাতে চাই না। আমরা এক মিথ্যার জগতেই বাস করি, নকল সান্ধ্যখবর পড়ি, নকল লড়াই করি। আমাদের সরকার নকল। কিন্তু আমরা এই নকলের দুনিয়াতেই সত্য খুঁজে পাই। তাই আমাদের গল্পগুলিও এক রকম হয়। আমরা মিথ্যা রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করি। কিন্তু আমাদের কাছে, যেহেতু আমরা নিজেরাই অভিনয় করছি তাই সেটি সত্যি বলে মনে হয়। অবস্থাটি সত্যি এই কারণে যে, এটি একটি দায়বদ্ধতা, এক সত্যিকারের সম্পর্ক। আমি এগুলোই আমার লেখায় তুলে ধরতে চাই।

প্রশ্ন: আপনি আপনার লেখায় বেশ কিছু সূক্ষ্ন সূক্ষ্ন জাগতিক বিষয়কে প্রায়ই তুলে ধরেন।

মুরাকামি: আমি বিস্তারিত বিবরণ দিতে খুবই পছন্দ করি। তলস্তয় সমস্তকিছুর বিবরণ পরিবেশন করেছিলেন তাঁর লেখায়। আমি একটা ছোট জায়গার উপরেও বিবরণ দেই। যখন আপনি খুব ক্ষুদ্র একটি বস্তুর বিস্তারিত বিবরণ দেবেন, আপনার মনোযোগ আরো বাড়তেই থাকবে। এবং তলস্তয়ের লেখার বিপরীত অবস্থায় পৌঁছাবেন – যখন আপনার সবকিছুকেই অবাস্তব বলে মনে হবে। আমি এটাই করতে চাই।

প্রশ্ন: অর্থাৎ তখন আপনি কোন একটি ক্ষুদ্র বিষয়ে এতোটাই মনোনিবেশ করে ফেলেন যে তা বাস্তবের থেকে অনেক ভিন্ন হয়ে পড়ে। এবং দিনের পর দিন ব্যবহৃত জিনিসগুলিকে কি আবার নতুন বলে মনে হয়?

মুরাকামি: যত কাছে আসে, তত আরো কম বাস্তব বলে মনে হয়। এটাই আমার লেখার ধরণ।

প্রশ্ন: আগে আপনি বললেন যে গার্সিয়া মার্কেজ আর কাফকার লেখনীর চেয়ে আপনার লেখার কায়দা একেবারেই আলাদা। আপনি কি নিজেকে তথাকথিত সাহিত্যিক মনে করেন না?

মুরাকামি: আমি একজন সমসাময়িক সাহিত্যিক, যে এইসব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যে সময়ে কাফকা লিখতেন, সে সময়ে কেবল গান, বই আর যাত্রা ছিলো। এখন আমরা ইন্টারনেট, সিনেমা, ভিডিও আরো কতকিছুর সুবিধা পাই। আমাদের প্রতিযোগিতাও তাই বেশি। প্রধান সমস্যা হলো সময়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মানুষ – আমি মূলতঃ অবসরপ্রাপ্ত মানুষদের কথাই বলতে চাই – তাদের হাতে ছিলো অফুরন্ত সময়। তাই অনেক বড় বড় বই পড়াও তাদের পক্ষে সম্ভব হতো। তারা যাত্রা দেখতে গিয়ে তিন-চার ঘণ্টাও বসে থাকতে পারতেন। কিন্তু আজকাল প্রত্যেকেই এতোটা ব্যস্ত যে কারোরই আর অবসর বলে কোন সময় নেই। মোবিডিক বা দস্তয়ভস্কির লেখা পড়তে এখনো খুব ভালোই লাগে কিন্তু সময়ের বড় অভাব। তাই কাহিনীগুলিও নিজেদের আমূল বদলে ফেলেছে। আমাদের সাহিত্যিকদের প্রায় পাঠকদের ঘাড় ধরে গল্প শোনাতে হয় এখন। তাই সমসাময়িক লেখকরা কাহিনী-বিন্যাসে ভিডিও গেমস, জ্যাজ এসবেরও সাহায্য নিচ্ছেন। আমার মতে ভিডিও গেমসই আজকাল কল্পনার সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে।


“বই লেখা গান গাওয়ারই মতো: প্রথমে আমি মূল বিষয়টিকে বাজাই, তারপরে সেটাকে আরো ঘষামাজা করি তারপরই সুন্দর একটা পরিসমাপ্তি আসে।”


প্রশ্ন: ভিডিও গেমস?

মুরাকামি: আমি নিজে ভিডিও গেমস খুব একটা খেলি না। কিন্তু আমি মিলটা অনুভব করতে পারি। কখনো কখনো আমার নিজেকে কোন একটি ভিডিও গেমসের স্রষ্টা মনে হয়। যখন আমি লিখি, তখন যেন আমি একজন খেলোয়াড়ও। যেন আমি একটি প্রোগ্রাম বানালাম এবং নিজে এখন তার মধ্যে আছি এবং আমার বাঁহাত জানছে না আমার ডানহাত কি করছে। এটা এক রকমের পৃথকিকরণ অনুভূতি।

প্রশ্ন: এর মানে আপনি কি এটা বোঝাচ্ছেন যে যখন আপনি লেখেন তখন যেমন জানেন না পরবর্তীতে ঠিক ঘটতে চলেছে, তেমনি আবার আপনারই একটা অংশ জানে কি ঘটবে?

মুরাকামি: আমার অজ্ঞাতসারে তাই-ই ঘটে। যখন লেখায় সম্পূর্ণ ডুবে যাই, আমি জানতে পারি যে একজন লেখক কি চাইছেন। এবং সেই মুহূর্তে এটাও জানতে পারি যে পাঠক কি ভাবছেন। এটি ভালো – এটি আমার লেখায় গতি এনে দেয়। কারণ আমিও পাঠকদের মতো জানতে চাই এর পরে কী ঘটবে। কিন্তু সেই গতি কখনো কখনো থামাতেও হয়। কারণ ঘটনাগুলি যদি খুব দ্রুত ঘটতে থাকে, পাঠকের ক্লান্ত ও একঘেয়ে লাগবে। তাই গল্প বলার সময় আপনাকে মাঝেমাঝে গতি কমাতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি তা কি করে করেন?

মুরাকামি: আমি কিভাবে যেন বুঝতে পারি, এবার একটু থামা প্রয়োজন।

প্রশ্ন: জ্যাজসঙ্গীত এবং গানের ব্যাপারে কিছু বলুন। তারা কিভাবে আপনার কাজে সাহায্য করে থাকে?

মুরাকামি: আমি ১৩-১৫ বছর বয়স থেকে জ্যাজ শুনছি। গানের একটা বড় প্রভাব থাকে আমার লেখার উপর: সুর, তাল, ছন্দ, কথা এবং সর্বোপরি সেসব অনুভূতিই আমাকে অনেকাংশে লিখতে সাহায্য করে। আমার খুব ইচ্ছা ছিলো সুরকার হবো। কিন্তু আমি বাদ্যযন্ত্র বিশেষ ভালো বাজাতে পারি না, তাই আমার পথে লেখাকেই বেছে নিলাম। বই লেখা গান গাওয়ারই মতো: প্রথমে আমি মূল বিষয়টিকে বাজাই, তারপরে সেটাকে আরো ঘষামাজা করি তারপরই সুন্দর একটা পরিসমাপ্তি আসে।

প্রশ্ন: চিরাচরিত জ্যাজসঙ্গীতে প্রাথমিক বক্তব্যটিই আবার শেষে ফিরে আসতে দেখা যায়। আপনিও কি আপনার লেখায় সেটা করেন?

মুরাকামি: কখনো-সখনো। জ্যাজ আমার কাছে একটা যাত্রাপথের মতো। এক মানসিক যাত্রা। লেখার থেকে তা বিন্দুমাত্র আলাদা নয়।

প্রশ্ন: আপনার প্রিয় জ্যাজ গায়ক কারা?

মুরাকামি: অনেকে আছেন। স্টান গেটজ এবং গেরি মুলিগ্যানকে পছন্দ করি খুব। আমার কৈশোরকালে তারা ভীষণ জনপ্রিয় গায়ক ছিলেন। মাইলস ডেভিস এবং চার্লি পার্কারকেও খুব পছন্দ করি। যদি এখন আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে কাকে আমি সবার প্রথমে রাখবো? তাহলে আমার উত্তর হবে মাইলস। মাইলস নিজে একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তিনি এমন একজন মানুষ যিনি নিজস্ব এক ধারা গড়ে তুলেছিলেন। আমি তাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি।

প্রশ্ন: জন কলট্রেনকে পছন্দ করেন না?

মুরাকামি: উমমম। ঠিকঠাক। যদিও তার কাজও কখনো কখনো অনুপ্রেরণা দেয়।

প্রশ্ন: অন্যান্য গানের ক্ষেত্রে আপনার কি মতামত?

মুরাকামি: আমি পুরনো দিনের গান খুব ভালোবাসি; বিশেষত Baroque সঙ্গীত। এবং আমার বই ‘কাফকা অন দ্য শোর’-এ যে কেন্দ্রীয় চরিত্র, সেই ছেলেটি রেডিও শোনে। যখন বেশকিছু রেডিওপ্রিয় পাঠকও আমার বই পছন্দ করেছিলেন, তখন আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম।

প্রশ্ন: আমার তো বিশেষ অবাক লাগছে না! ‘কাফকা অন দ্য শোর’ বিষয়ে কিছু বলুন না!

মুরাকামি: এটি আমার লেখা সব থেকে জটিল বই – ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রোনিকল’-এর চেয়েও জটিল। এটিকে এভাবে বুঝিয়ে বলা খুব মুশকিল। এখানে দুটি গল্পকে সমান্তরালভাবে চলতে দেখা যায়। এখানে আমার কেন্দ্রীয় চরিত্র এক পনের বছরের কিশোর। তার নাম, তার প্রথম নামটি কাফকা। অন্য গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র এক ষাট বছরের প্রৌঢ়। তিনি অশিক্ষিত। পড়তে বা লিখতে পারেন না। কিছুটা স্থুলবুদ্ধির মানুষ। কিন্তু তিনি আবার বিড়ালদের সাথে কথা বলতে পারেন। কাফকা ছেলেটিকে তার বাবা অভিশাপ দিয়েছিলেন – অনেকটা অয়েদিপাসের মতো অভিশাপ: তুমি তোমার পিতাকে হত্যা করে মায়ের প্রেমে পড়বে। সেই অভিশাপের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য সে তার বাবার কাছ থেকে অনেক দূরে এক জায়গায় পালিয়ে গিয়েছিল। সেখানে সে খুবই অদ্ভুত এক পৃথিবীর সাথে পরিচিত হয়, অনেক অবাস্তব এবং স্বপ্নীল বস্তুর সাথেও।

প্রশ্ন: গঠনশৈলীর দিকে ভাবতে গেলে এটা আপনার ‘হার্ড বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যান্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ –এরই মতো। এখানেও এক অধ্যায় থেকে আরেক অধ্যায়ে এক গল্প থেকে আরেক গল্পে মিলে যায়?

মুরাকামি: ঠিক। প্রথমে আমি হার্ড বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ডেরই পরবর্তী অংশ লিখতে শুরু করেছিলাম। পরে ঠিক করি সম্পূর্ণ আলাদা গল্প লিখবো। কিন্তু কায়দা ওই একই, অনেকটাই সাদৃশ্য আছে। কারণ মূল গল্প এবং গল্পের আত্মা একই। মূল বিষয় হলো এই পৃথিবী এবং অপর পৃথিবীকে কেন্দ্র করে। তার মাঝের এক যাতায়াতের গল্প এটি।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি তো এখানেই থাকেন। তাই না?

মুরাকামি: কারণ এখানে আমি অনামী ব্যক্তি। ঠিক নিউ ইয়র্কে থাকাকালীন সময়ে যেরকম ছিলাম। এখানে আমাকে কেউ চেনে না। আমি যেখানে ইচ্ছা সেখানেই যেতে পারি। আমি যদি ট্রেনে চড়েও যাই কোন জায়গায়, তাতেও কারো কিছু আসে যায় না। টোকিওর এক ছোট্ট শহরতলীতে আমার বাড়ি, সেখানে সবাই চেনে আমায়। যখনই হাঁটতে বেরোই, কেউ না চিনতে পারেই। কখনো কখনো এটি যথেষ্ট বিরক্তিকরও বটে।

প্রশ্ন: Ryu Murakami এর কথা আগেই বলেছিলেন। উনি নাকি এক ভিন্ন বিষয়বস্তুকে ওনার লেখায় তুলে ধরেন?

মুরাকামি: আমার লেখার ধরণ খানিকটা আধুনিকোত্তর; ওনার লেখা আরো বেশি মূলধারার। কিন্তু যখন প্রথমবার ‘কয়েন লকার বেবিজ’ পড়েছিলাম, আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেছিলাম। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমিও এরকম কিছু উপন্যাস লিখবো, যা পাঠকের মনে ভীষণভাবে রেখাপাত করবে। তখনই আমি ‘আ ওয়াইল্ড শিপ’ লিখতে শুরু করি। এটা খানিকটা প্রতিদ্বন্দ্বীতাই বলা যায়।

প্রশ্ন: আপনারা কি বন্ধু?

মুরাকামি: আমাদের সম্পর্ক ভালোই। অন্তত আমরা শত্রু নই। ওনার এক নিজস্ব, স্বাভাবিক প্রতিভা আছে। ঠিক যেন মাটির নিচেই তেলের একটা খনি আছে। আমার ক্ষেত্রে, সেই তেলই এতো গভীরে থাকে যে তার সন্ধান করতে গেলে আমাকে ক্রমাগত মাটি খুঁড়তে হয়। এতে প্রচুর পরিশ্রম হয় এবং যথেষ্ট সময়সাপেক্ষও। কিন্তু সেই অবস্থায় আমি যে মুহূর্তে পৌঁছে যাই, নিজের মধ্যে যথেষ্ট দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস জন্মায়। আমার জীবনও অনেক বেশি শৃঙ্ক্ষলাবদ্ধ হয়ে ওঠে। তাই মাঝেমাঝে এরকম আত্মবিশ্বাস একেবারেই মন্দ নয়।

জন রে: আপনাকে ধন্যবাদ।


অনুবাদক পরিচিতি:
পৌলমী সরকার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে সম্মানের ছাত্রী।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য