আমার সিনেমা অনেকটা দর্শকের মিরর ইমেজের মতো — কিম কি দুক | ভাষান্তর : রাফসান গালিব

ব্যাড গাই সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পর যথারীতি ক্রিটিকদের তুলোধুনোর শিকার হলেন এর নির্মাতা কিম কি দুক। এদিকে সিনেমাটি লুফে নিয়েছে দর্শক। চুপ মেরে আছেন কিম। কারণ তিনি মনস্থির করেছেন, আর কোনো ইন্টারভিউ দেবেন না। কিন্তু কথা বলার জন্য কিমকে ঠিকই রাজি করিয়ে ফেলেন কোরিয়ান সিনেমার ক্রিটিক জিয়ং সিয়ং ইল। ব্যাড গাই মুক্তি পায় ২০০১ সালে। তার অল্প সময়ের মধ্যে কোরিয়ান ম্যাগাজিন সিনে টুয়েন্টি ওয়ানে জিয়ংয়ের নেয়া কিমের এ ইন্টারভিউ প্রকাশ হয়। এক যৌনপল্লীকে ঘিরে ব্যাড গাই-এর গল্প। তেমনই এক যৌনপল্লীতে বসে কিমের সঙ্গে কথা বলেন  জিয়ং। সিনেমাটির বিষয়বস্তুকে ফোকাসে রেখে সেই আলাপে উঠে আসে কিমের চিন্তা ও কাজের বিশ্লেষণ। কিম কিভাবে কোরিয়ান সমাজের বাস্তবতার দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হলেন এবং সিনেমার মাধ্যমে দর্শকদেরও সেই জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিলেন, সেটা ঘুরেফিরে আসে। এমন সময় ইন্টারভিউটি নেয়া হয়, যখন কিমের ওপর তার দর্শক, বিরোধী, ক্রিটিক, পুরা ইন্ডাস্ট্রি রীতিমতো ক্ষুব্ধ। সে একটা জানোয়ার- এমন গালিগালাজ করতো মানুষ। ক্রিটিকরা আখ্যা দিয়েছিল সাইকোপ্যাথ। তার সিনেমা পছন্দ করা দর্শকরাও স্বীকার করত যে, ঠিকঠাক তাকে বুঝে উঠতে পারছে না তারা। এভাবেই কোরিয়ান সমাজের অন্ধকার দিকগুলো স্ক্রিনে হাজির করে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতেন কিম, বদ্ধমূল ধারণায় আঘাত করে উত্তেজিত করে দিতেন, মেটাফর দিয়ে বিভ্রান্তিতে ফেলে দিতেন। কিমের ছবি সরাসরি কোনো রাজনীতিকে উসকে দেয় না, তবে প্রচ্ছন্ন অবস্থায় বরাবরই কোরিয়ার রাজনৈতিক অবস্থা, টানাপড়েন, আর্থসামাজিক অবস্থাকে গল্পের মোড়ক দিয়ে তুলে ধরেছিলেন তিনি। আবার শব্দ, মিউজিক, স্থান, দৃশ্য সবকিছু দিয়ে তৈরি করতেন পরাবাস্তব এক জগত। সেই জগতের সঙ্গে কঠোর বাস্তবতার এমন সংযোগ তৈরি করতেন তিনি, যাতে দর্শকদের জন্য নির্বিকার থাকা সহজ ছিল না কখনো। মাধ্যমিক স্কুলের দোরও তিনি পার হননি, এমনকি কোনো ফিল্ম স্কুলেও পড়াশোনা করেননি। কিন্তু বাস্তবতা এবং অভিজ্ঞতা মিলে তার মধ্যে যে শক্তিশালী চিন্তা তৈরি করে দিয়েছিল সেটাই তাকে সমসাময়িক কোরীয় নির্মাতাদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। গত ১১ ডিসেম্বর চলে গেছেন কিম। বিদেশের মাটিতে মহামারীর কাছে হার মানলেন তিনি। মৃত্যুর অন্তত আঠার বছর আগে এই ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন তিনি। যেখানে এমন অনেক কিছু খোলাসা করেছেন কিম, যা মানুষকে তার সিনেমার আরও কাছে নিয়ে যাবে। 


প্রথাগত নিয়ম এবং বিকল্প চিন্তার মধ্যে যে বাউন্ডারি সেটিকে আমি ব্লার করে দিতে পছন্দ করি।


জিয়ং সিয়ং ইল

এখন অবধি আপনার সিনেমা সাধারণ দর্শকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়নি। তবে ব্যাড গাই আলাদা। অবশেষে ছবিটা জনপ্রিয়তা পাওয়ায় আপনার অনুভূতি কি?

কিম কি দুক

আমার অনুভুতি? এ নিয়ে আলাদা কোনো অনুভূতি নেই। আমার কাজের বাজার বাড়ছে। আমি মনে করি এই দর্শকদের এক তৃতীয়াংশ আমার ছবি পছন্দ করবে, যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ দর্শক আমার আর কোনো ছবিই দেখতে চাইবে না। ব্যাড গাই’র বিতর্কিত সাবজেক্ট দর্শকদের আমার ছবি থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, এমনকি চিরকালের জন্য। ফলে এ নিয়ে আমার কোনো আলাদা অনুভূতি নেই।

জিয়ং সিয়ং ইল আমার প্রস্তাব ছিল, ইওংসানের এই যৌনপল্লীতে বসে আপনার সাক্ষাতকার নেব। ব্যাড গা্ইয়ের মূল লোকেশানও ছিল এমনই একটা এলাকা। এখন যৌনপল্লীতে বসে কথা বলছি, এ জায়গা নিয়ে আপনার অভিমত কি?

কিম কি দুক যৌনপল্লীও অন্যান্য জায়গার মতোই যেখানে মানুষ কাজ করে জীবিকা আয় করে। তবে একটা বড় পার্থক্য হচ্ছে, এখানে বসবাসরত মানুষগুলো দিনে যে কাজ করে, রাতেও একই কাজ করে। তাদের কাজই তাদের জীবন। শীতল পৃথিবীর মানুষেরা এখানে উষ্ণতা নিতে আসে। এই জগতের চরিত্রগুলোকে আমার সিনেমায় আমি নিয়ে এসেছি কারণ এখানে বাস করা এবং কাজ করা লোকদের জীবন অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। তারা এ গল্পের মৌলিক উপাদান।

জিয়ং সিয়ং ইল

পতিতাবৃত্তিকে আপনি কাজ বলছেন। কোন ভাবনা থেকে এটিকে শ্রম আকারে দেখেন?

কিম কি দুক বেশ কিছু বছর কয়েকটি কারখানায় কাজ করেছি আমি। যদিও সেসব চাকরি খুব ভালো কিছু ছিল না। কিন্তু আমার জন্য সেগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে মনে করতাম। আমার মধ্যে কোনো লজ্জাবোধ ছিল না। কারণ আমি মনে করতাম, কারখানায় কাজ করাই আমার ভবিষ্যত। তো নিজের অতীতের দিকে তাকিয়ে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হিসেবে কেউ যদি কোনো কঠিন জীবনকে বেছে নেয় তাহলে সেটিই তার জন্য বাস্তবতা। সেওংচুল নামে এক নামকরা কোরিয়ান সন্ন্যাসী বলেছিলেন, পাহাড় হচ্ছে পাহাড়। মানে কেউ চাইলে সেটিকে পরিবর্তন করতে পারবে না। তেমনি জীবন হচ্ছে জীবন। মানুষের সচেতন প্রচেষ্টার পরও জীবনে এমন কিছু ঘটে যায় যা অচিন্তনীয়। ফলে কারও প্রতিদিনকার কাজ তার জীবন হয়ে ওঠে, অন্যরা সেটিকে সম্মান বা গ্রহণ না করলেও।

জিয়ং সিয়ং ইল

কোরিয়ান সিনেমাগুলোতে যৌনপল্লীকে নিজস্ব সময়ের প্রতীকী জায়গা থেকে ব্যবহার করা হয়েছে। যখন শুনলাম আপনি এমন সিনেমা বানিয়েছেন, বুঝলাম সমাজ নিয়ে আপনার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এখানে থাকবে।

কিম কি-দুক

মানুষ আমার এ গল্প স্বাভাবিকভাবে নেবে এমনটা আমি আশা করি। এ গল্পের প্রত্যেকটি উপাদান মানে এর ব্যাকগ্রাউন্ড এবং চরিত্রগুলো নেওয়া হয়েছে সত্যিকার একটি জায়গার বাস্তব মানুষ থেকে। আমার সেরাটাই আমি করেছি। এ সিনেমায় কোরিয়ার আমাদের বিভক্ত সমাজকে দেখানো হয়েছে এবং বদ্ধমূল সমাজ ব্যবস্থার নিবিড় সমালোচনা করা হয়েছে। আপনি জানেন, কোরিয়ান সমাজ ব্যবস্থার অনেক কিছুর প্রতি আমার বিশ্বাস নেই। প্রথাগত নিয়ম এবং বিকল্প চিন্তার মধ্যে যে বাউন্ডারি সেটিকে আমি ব্লার করে দিতে পছন্দ করি। টিপিক্যাল কোরিয়ান সমাজে এমন অনেক কিছু আছে, উদাহরণস্বরূপ, অনেক কোরিয়ান অন্যদের বিচার করে শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সামাজিক অবস্থান দিয়ে। একটা নির্দিষ্ট উপায়ে মানুষ আমাকে দেখে। তারা কিন্তু একজন সৃজনশীল সিনেমা নির্মাতা হিসেবে আমাকে নিয়ে কথা বলে না। তারা আমার নিম্ন আর্থ-সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং প্রথাগত শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাব নিয়ে কথা বলে। আমার কঠোর সমালোচক এবং অনুরাগীরাও এই বৈষম্যমূলক চিন্তা নিয়ে সচেতন না হতে পারেন কারণ তারা সামাজিক ব্যবস্থার কেন্দ্রেই বাস করেন। তারা তাদের বৈষম্যমূলক চিন্তা এবং আচরণগুলো লক্ষ্য করে না। নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থান থেকে আসা মানুষও যে অন্য সবার মতোই মানুষ, সেটি দেখিয়ে দেয় ব্যাড গাই। তারা কোনো ভাগাড়ের বর্জ্য না।

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, আর কোনো ইন্টারভিউ দেবেন না। আমি দুঃখিত যে, আপনার কথা আমি ভঙ্গ করিয়েছি।

কিম কি-দুক

আমি মনে করি না এটা ইন্টারভিউ। এটা বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ।

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনার সিনেমার অনেক রিভিউ আপনাকে আহত করেছে। তবে অনেক ক্রিটিক আপনার নতুন সিনেমা ব্যাড গাই নিয়ে কথা বলছেন। সিনে টুয়েন্টি ওয়ানের শেষ সংখ্যায় সাহিত্য সমালোচক জাং কেওয়া-রি এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ পিক স্যান-বিনের ইন্টারভিউ ছাপানো হয়েছে। সিনেমাটিতে আপনার ন্যারেটিভ স্টাইল নিয়ে জাং প্রশ্ন তুলেছেন এবং তার মতে, একেবারে নতুন ফরম্যাট। আপনার সিনেমার ন্যারেটিভ নিয়ে ইনডেপথ স্টাডি আগে কখনো হয়েছে তিনি মনে করেন না। পিক মনে করেন, বেড গাই নিয়ে মনস্তাতিত্ত্বক রিডিং দরকার। তাদের এই মতামতগুলোকে আপনি কীভাবে দেখেন?

কিম কি-দুক

ওই রিভিউগুলোর কারণেই আমি আর কোনো সাক্ষাৎকার দেব না বলেছি। জাং কেওয়া-রি এবং পিক স্যাং-বিনের এই মতামত সুন্দর। আমি সব মতামতকে সম্মান জানাই।

তবে আমি ক্রিটিকদের মধ্যে কাপুরুষতা দেখি এবং আমি মিসকোটেড হতে পছন্দ করি না।

সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি সাক্ষাত্কারে আমার কথাকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং সেগুলোকে আমার বিরুদ্ধেই তারা ব্যবহার করেছে। যেমন, শিম ইয়ং-সিওপ নামে আরেক ফিল্ম ক্রিটিক বলেছেন, আমার মা কোনোভাবেই আমাকে ভালবাসতেন না। আমার পরিবার সম্পর্কে এমন মিথ্যা এবং অপমানজনক কথাবার্তা আমাকে আহত করে। এ ধরনের বক্তব্য কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। আমি আগেই বলেছি, আমার মা ছিলেন নিরক্ষর। আমি এবং আমার ভাইবোনদের জন্য তিনি ছিলেন অসাধারণ একজন মা। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমার কাজ নিয়ে বলতে ব্যাক্তিগত আক্রমণের মতো কিছু করার দরকার নেই।  

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনার সিনেমা নিয়ে রিভিউগুলো পড়তে গিয়ে আমি খুবই অবাক হয়েছি। অনেক তথাকথিত ফিল্ম ক্রিটিক যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী মনে করে, তারা ব্যাড গাইকে না মেটাফোর হিসেবে দেখেছে বা, না কোরিয়ান সমাজের কোনো প্রতীক আকারে দেখেছে। মানুষকে দেখে অবাক লাগে, আপনার সিনেমাকে আরও গভীরভাবে না নিয়ে বরং কড়া প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। কেন ক্রিটিকরা আপনার সিনেমা নিয়ে এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়?

কিম কি-দুক

বাস্তবতার ন্যারেটিভেই আমার কাজকে দেখার মানুষের যে প্রবণতা, এটা ভালো। সিনেমার টেক্সটে যদি বাস্তব চরিত্র নিয়ে একটি বাস্তব গল্প দেখানো হয়, তাহলে সিনেমাকে দেখার এটাই ঠিক উপায়। বাস্তবতাকে দেখার এই সেন্সই ব্যাড গাই-এর অস্তিত্বের কারণ।

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনার সিনেমা দর্শকদের মধ্যে প্রবল ইমোশন তৈরি করে। শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে তাদের ক্ষেপিয়ে দেন।

কিম কি-দুক

এটা সত্য। মেটাফোরকে চিত্রায়ণ করতে আমি মিডিয়াম হিসেবে সিনেমাকে ব্যবহার করি। তবে অনেক মানুষ হয়তো সিনেমার রুঢ় বাস্তবতা দেখতে গিয়ে আমার সেই মেটাফোর দেখে না। আমি কোথাও পড়েছিলাম যে, একজন নির্মাতার উচিত তার কথাকে যতটা সম্ভব সামলে রাখা এবং সিনেমাকে কথা বলতে দেয়া। একজন নির্মাতার উচিত তার লাইফস্টাইল এবং চিন্তা দর্শকদের থেকে আড়াল করে রাখা। আমি মনে করি, একজন ফিলোসফার এবং আর্টিস্টের নিজেকে হাজির করার এটাই ঠিক উপায়। তবে আমি বলছি না যে, আমি একজন আর্টিস্ট।

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনি একজন আর্টিস্ট (হেসে)

কিম কি-দুক

কোনও আর্টিস্টের উচিত নয়, তার চিন্তাকে সরাসরি প্রকাশ করে দেয়া। একইসঙ্গে, মানুষ যদি আমার সিনেমায় মেটাফরগুলো দেখতে পায় সেটি আমাকে আনন্দিত করবে।

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনি বলেছিলেন যে, আপনার ব্যক্তিগত ইতিহাস নিয়ে আপনার সিনেমা বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করেন যেসব ক্রিটিক, তাদেরকে আপনি পছন্দ করেন না। আমি আপনার সঙ্গে একমত, এবং আমি সেটা করতে যাচ্ছি না (হেসে)। কিন্তু, ব্যাড গাই আমাকে আপনার বাবার ব্যাপারে ভাবিয়েছে! তিনি কেমন মানুষ ছিলেন?

কিম কি-দুক

আমার বাবা একজন চমৎকার মানুষ ছিলেন, কিন্তু আমার জন্য চমৎকার ছিলেন না। তিনি কোরিয়ান যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন এবং অনেক বছর শারীরিক যন্ত্রণা ভোগেন। আমার বেড়ে ওঠার সময়টাতে তিনি খুব কঠোর ছিলেন। অল্পতেই তিনি খুব রেগে যেতেন, ফলে তার আশেপাশে থাকাটা স্বাচ্ছন্দ্যকর ছিলো না। আমার শেষ সিনেমা ‘অ্যাড্রেস আননোন’ (২০০১)-এ বাবার সেন্ট্রাল ক্যারেকটারটা আমার বাবার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। তারা দুজনই কোরিয়ান যুদ্ধে অংশ নিয়ে গর্ববোধ করতেন। যদিও ত্রিশ বছর পর শেষপর্যন্ত যুদ্ধের সময় তাদের সাহসিকতার কথা স্বীকৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা দুজনই সামাজিকভাবে হেয় হয়েছিলেন। যদিও আমার বাবা আমার সবচেয়ে ভালোটা চাইতেন, আমার দরকার ছিলো তার কাছ থেকে সরে যাওয়া। যাহোক, তিনি আমাকে নৌবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করেছিলেন। বাড়ি ফিরে যাওয়া এড়াবার জন্য আমি সেনাবাহিনীর চাকরি শেষ করে ইউরোপেই থেকে যাই। এখন আমার বাবা আমার কাছে ভালো, এবং আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি বুঝি না, আমার বাবার প্রভাব আমাকে অন্যান্য কাজ থেকে দূরে রেখেছে, এমন কুটিল মন্তব্য কেন ক্রিটিকরা করে। সত্যি কথা হলো, আমি যা করতে চেয়েছি তা করতে কখনোই বাধা দেননি আমার বাবা৷ যদিও তিনি চেয়েছিলেন আমি একটা কারখানার ম্যানেজার হই, আমি এই ধরনের কাজ থেকে পিছু হটে এসেছি  এবং একজন আর্টিস্ট হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে শুরু করেছি।

জিয়ং সিয়ং ইল

আমি আপনার বাবার বিষয়ে জানতে চাইলাম কারণ আপনার সিনেমার অনেক চরিত্রকেই মনে হয় তারা বাবা হতে ভয় পায়। একইসঙ্গে, বাবার সান্নিধ্যও তাদের মধ্যে ভীতি তৈরি করে। উত্তর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বিরাজমান জটিল আদর্শগত বিভেদের মুখোমুখি হতে চায় না এমন মানুষগুলোকেই প্রতিনিধিত্ব করে এই চরিত্রগুলো?

কিম কি-দুক

‘অ্যাড্রেস আননোন’-এর সব চরিত্রের মধ্যেই একটা কিছু খামতি রয়েছে, যেটাকে আমি আধুনিক কোরিয়ান সমাজে বিরাজমান সমস্যাগুলোর একটা প্রতীক হিসেবে ভাবি। আমাদের বাবারা আমাদেরকে এমন একটা সমাজে বড় করে তুলেছেন যেখানে প্রচুর অসংগতি রয়েছে। ‘হ্যান’ মানে কোরিয়ানদের জীবনে গভীর দুঃখবোধ, যেটা ভুলে যাওয়া যায় না, আমাদের বাবার প্রজন্ম থেকে চলে আসছে। যেমন, আমার বাবা এখনো ‘রেড কমিউনিস্ট’ এই নামটা ঘৃণাভরে উচ্চারণ করেন। তিনি যখন দেখেন দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার উত্তর কোরিয়াকে চাল দিচ্ছে, তিনি রেগে যান! খেয়াল করে দেখুন, তিনি উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের দ্বারাই গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন এবং নির্যাতিত হয়েছিলেন। কোরিয়ান যুদ্ধ আমাদের আধুনিক সময়ের সবচেয়ে মারাত্মক এবং চরম অভিজ্ঞতা। এই স্মৃতিগুলো ভুলে যাওয়া তার জন্য কঠিন। যদিও তার শারীরিক যন্ত্রণা লাঘব হয়েছে, মানসিক আঘাতগুলো থেকে তিনি কখনোই সেরে উঠবেন না। আমার বাবার মানসিক পীড়নগুলো আমারও একান্ত হয়ে উঠেছিলো। এই অনুভূতিগুলোর প্রজেকশন আমার সিনেমায় রয়েছে। কোনো না কোনোভাবে আমার বাবার ফেলে আসা অভিব্যক্তি আমার বর্তমান সচেতনতার সাথে মিশে গেছে। এটাই  আমাকে ‘অ্যাড্রেস আননোন’ বানানোর আইডিয়া দেয়।

জিয়ং সিয়ং ইল

কোরিয়ান যুদ্ধ হচ্ছে আপনার বাবার হান বা গভীর দুঃখবোধ, আপনার হান কোনটা?

কিম কি-দুক

আমারটা হচ্ছে, আমি মেইনস্ট্রিম সমাজ বা এর কালচারাল সীমানা কোনোটার সঙ্গেই খাপ খাওয়াতে পারছি না। অন্য কোরিয়ানদের যাদের এমন অবস্থা তারা ইনফিউরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে। ভাগ্যক্রমে, কয়েক বছর আগে আমার ভেতর থেকে এ অনুভূতিটা আমি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি, যখন আমি কোরিয়া ছাড়ি এবং ফ্রান্সে চলে যাই। দেশের বাইরের অভিজ্ঞতা নিজেকে আবিষ্কার করতে আমাকে সাহায্য করেছে। যেসব কোরিয়ান ইনফিউরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে তারা জানে না কোনটা ‘কালচার’ বা কোনটা ‘হাই ক্লাস’। সমাজ থেকে পাওয়া এমন অদ্ভুত জিনিসের মালিকানা দাবি করে বসে থাকে তারা, যেন তারা ফ্যান্টাসির জগতে বাস করছে। তারা মুক্তচিন্তক নয়। আনবায়াসড হয়ে আমার সিনেমা নিয়ে চিন্তা করার মতো স্বাধীন নয় তারা। তারা বলে আমার সিনেমা অদ্ভুত এবং র বা কাঁচা। আমি এই ‘র’ শব্দটা ঘৃণা করি। এটি শুনলে মনে হয় আমার সিনেমা ভালো মতো বানানো না বা উন্নত না।

জিয়ং সিয়ং ইল

শুনতে আপনার কাছে অবাক লাগতে পারে যে, আমার মতে আপনার সিনেমা আপনার ব্যাক্তিগত জীবনের গল্পকে প্রতিফলিত করে। তার মানে এটা না, আপনার সব সিনেমার মেইন ক্যারেক্টার আপনাকে ঘিরেই। আমি আসলে আপনাকে এবং আপনার জীবনকে দেখি সাইড এবং মার্জিনাল ক্যারেক্টারের মধ্যে। যেমন ব্যাড গাই-এ দেখা যায়, হান কি (প্রধান ক্যারেক্টার) যখন নায়িকাকে প্রকাশ্যে চুমু খায়, তিনজন সেনাসদস্য এসে তাকে বেধড়ক পেটায়। আপনি কি আপনার সামরিক জীবনের অতীতকে পছন্দ করেন না?

কিম কি-দুক

আপনার প্রশ্নে দুইটা দিক আছে। আমি নতুন একটা সিনেমার গল্প লিখছি, যার নাম হরাইজন। কোরিয়ান নৌবাহিনীতে থাকাকালীন যন্ত্রণার মাধ্যমে যৌন অভিজ্ঞতা নেওয়ার গল্প এটি। আমাদের শেখানো হতো, একবার নৌসেনা মানে আজীবন নৌসেনা। এ ইতিবাচক কথা আমাদের মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকবে কারণ এটা পরস্পরের প্রতি আমাদের বিশ্বস্ততার বিষয়টা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু এই সামরিক  চরিত্রকে নেতিবাচকভাবেও পড়া যায়। আমরা বলতে পারি, যে তিন সেনাসদস্য হান-কি’কে পেটাচ্ছে তারা আসলে ব্যাড গাই। তারা কিন্তু একজন মানুষকে পিটিয়ে মজা নিয়েছিল। এক্ষেত্রে কাউকে বুলিং করা এবং আহত করা দুইটাই খারাপ কাজ। আমার সিনেমা অনেকটা দর্শকের মিরর ইমেজের মতো। কোনো একটি জায়গা ঠিকই সিনেমাটির সঙ্গে কারও (দর্শক) সম্পর্ককে রিফ্লেক্ট করবে। স্ক্রিনের চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের দেখি এবং নানা উপায়ে তাদের সঙ্গে যুক্ত করি। একজন দর্শক আরেকজন দর্শক থেকে আলাদা এবং এটি বলা কঠিন যে, কার ভাবনা ঠিক এবং কার ভাবনা ভুল।

জিয়ং সিয়ং ইল

শক্তিশালী সাবজেক্টের কারণে আপনার সিনেমা আপনার দর্শকদের বড় অংশকে আলাদা করে দেয়। আপনার সিনেমাগুলো দেখলে কিছুটা বেদনাদায়ক এবং অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা দেয়।

কিম কি-দুক

মানুষ আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমি একজন নৈতিকতাপূর্ণ মানুষ কী না, আমার উত্তর থাকে, না।

আমি এমন একজন মানুষ, কোরিয়ান সমাজের অন্ধকার এবং দুর্বল দিকগুলো দেখাতে যার কোনো ভীতি নেই। এটা আমার নৈতিক জায়গা।

আগের প্রজেক্টগুলো থেকে আরও বেশি নির্মল সিনেমা আমি বানাতে পারতাম, কিন্তু আমার ভয় হয় যে নরমাল কিছু বানানোর জন্য আমাকে দোষারোপ করা হবে। আবার একইসময়ে আমার মধ্যে এ ভীতি কাজ করে যে, ভবিষ্যতে মেইনস্ট্রিম সিনেমা বানানোর জন্য আমার মধ্যে কোনো ক্রিয়েটিভিটি নেই, এর কারণ, আমার ব্যাকগ্রাউন্ড হচ্ছে বিতর্কিত বিষয় নিয়ে সিনেমা বানানো।

জিয়ং সিয়ং ইল

শেষ পয়েন্টটা কি আরও ব্যাখ্যা করবেন?

কিম কি-দুক

আমি চাই, আমার সহায়তা ছাড়াই সমাজ নিজেকে দেখুক, সেটি আসলে কি। কোরিয়াতে যেসব সামাজিক সমস্যা, সেগুলোর দিকে মনোযোগ প্রয়োজন আছে। আমাদের সমাজের অন্ধকার দিকটা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। সমাজ নিয়ে আমার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব আছে, আমার সিনেমা সেটিকেই রিফ্লেক্ট করে।

জিয়ং সিয়ং ইল

ব্যাড গাই-এর শেষ দৃশ্য হচ্ছে, ভ্রাম্যমান পতিতাবৃত্তির ট্রাকটি কাস্টমার সন্ধানে বের হয়। এমন পাপময় একটা দৃশ্যে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে খ্রিস্টানদের গসপেল সঙ্গীত ব্যবহার করেছেন, যেটি গাওয়া হয় নাজাত বা পরিত্রাণের জন্য। আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন যে, আপনার সিনেমার ক্যারেক্টারগুলো নাজাতের ব্যাপারে আরও বেশি আগ্রহী? কিংবা পাপ এবং নাজাতের প্রতি সমানভাবে আগ্রহী? এ শেষ দৃশ্য দেখে মনে হয় অন্য একটা সিনেমার শুরু। সম্ভবত এটি আপনার সিনেমাগুলোকে বোঝার মূল উপায়।

কিম কি-দুক

আমার প্রথম সিনেমা ক্রোকোডাইল (১৯৯৬) থেকে এখন পর্যন্ত সব সিনেমা ধর্মীয় মোটিফ দিয়ে তৈরির চেষ্টা করেছি। এসব মোটিফ হচ্ছে পাপ এবং আত্মদহনের সংমিশ্রণ। মানুষ আমার সিনেমায় কী দেখতে চায়, সেটি তাদের সিদ্ধান্ত। আমি সেটা দর্শকদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিলাম। তবে আমার গল্পগুলোতে ধর্মীয় উপাদানগুলো মাদার নেচার এবং ইনোসেন্সের পথ দেখায়। এই সময়ে আমাদের জীবন কৃত্রিমতায় ভরপুর। ইনোসেন্সকে ফিরে পেতে আমাদের আরও বেশি চেষ্টা করতে হবে। সুতরাং ব্যাড গাই-এর পাপিষ্ট চরিত্রগুলোর ঈশ্বরের বাণী শোনা দরকার।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this:
আমার সিনেমা অনেকটা দর্শকের মিরর ইমেজের মতো — কিম কি দুক | ভাষান্তর : রাফসান গালিব | শিরিষের ডালপালা । সাহিত্য ওয়েবজিন

আমার সিনেমা অনেকটা দর্শকের মিরর ইমেজের মতো — কিম কি দুক | ভাষান্তর : রাফসান গালিব

ব্যাড গাই সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পর যথারীতি ক্রিটিকদের তুলোধুনোর শিকার হলেন এর নির্মাতা কিম কি দুক। এদিকে সিনেমাটি লুফে নিয়েছে দর্শক। চুপ মেরে আছেন কিম। কারণ তিনি মনস্থির করেছেন, আর কোনো ইন্টারভিউ দেবেন না। কিন্তু কথা বলার জন্য কিমকে ঠিকই রাজি করিয়ে ফেলেন কোরিয়ান সিনেমার ক্রিটিক জিয়ং সিয়ং ইল। ব্যাড গাই মুক্তি পায় ২০০১ সালে। তার অল্প সময়ের মধ্যে কোরিয়ান ম্যাগাজিন সিনে টুয়েন্টি ওয়ানে জিয়ংয়ের নেয়া কিমের এ ইন্টারভিউ প্রকাশ হয়। এক যৌনপল্লীকে ঘিরে ব্যাড গাই-এর গল্প। তেমনই এক যৌনপল্লীতে বসে কিমের সঙ্গে কথা বলেন  জিয়ং। সিনেমাটির বিষয়বস্তুকে ফোকাসে রেখে সেই আলাপে উঠে আসে কিমের চিন্তা ও কাজের বিশ্লেষণ। কিম কিভাবে কোরিয়ান সমাজের বাস্তবতার দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হলেন এবং সিনেমার মাধ্যমে দর্শকদেরও সেই জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিলেন, সেটা ঘুরেফিরে আসে। এমন সময় ইন্টারভিউটি নেয়া হয়, যখন কিমের ওপর তার দর্শক, বিরোধী, ক্রিটিক, পুরা ইন্ডাস্ট্রি রীতিমতো ক্ষুব্ধ। সে একটা জানোয়ার- এমন গালিগালাজ করতো মানুষ। ক্রিটিকরা আখ্যা দিয়েছিল সাইকোপ্যাথ। তার সিনেমা পছন্দ করা দর্শকরাও স্বীকার করত যে, ঠিকঠাক তাকে বুঝে উঠতে পারছে না তারা। এভাবেই কোরিয়ান সমাজের অন্ধকার দিকগুলো স্ক্রিনে হাজির করে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতেন কিম, বদ্ধমূল ধারণায় আঘাত করে উত্তেজিত করে দিতেন, মেটাফর দিয়ে বিভ্রান্তিতে ফেলে দিতেন। কিমের ছবি সরাসরি কোনো রাজনীতিকে উসকে দেয় না, তবে প্রচ্ছন্ন অবস্থায় বরাবরই কোরিয়ার রাজনৈতিক অবস্থা, টানাপড়েন, আর্থসামাজিক অবস্থাকে গল্পের মোড়ক দিয়ে তুলে ধরেছিলেন তিনি। আবার শব্দ, মিউজিক, স্থান, দৃশ্য সবকিছু দিয়ে তৈরি করতেন পরাবাস্তব এক জগত। সেই জগতের সঙ্গে কঠোর বাস্তবতার এমন সংযোগ তৈরি করতেন তিনি, যাতে দর্শকদের জন্য নির্বিকার থাকা সহজ ছিল না কখনো। মাধ্যমিক স্কুলের দোরও তিনি পার হননি, এমনকি কোনো ফিল্ম স্কুলেও পড়াশোনা করেননি। কিন্তু বাস্তবতা এবং অভিজ্ঞতা মিলে তার মধ্যে যে শক্তিশালী চিন্তা তৈরি করে দিয়েছিল সেটাই তাকে সমসাময়িক কোরীয় নির্মাতাদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। গত ১১ ডিসেম্বর চলে গেছেন কিম। বিদেশের মাটিতে মহামারীর কাছে হার মানলেন তিনি। মৃত্যুর অন্তত আঠার বছর আগে এই ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন তিনি। যেখানে এমন অনেক কিছু খোলাসা করেছেন কিম, যা মানুষকে তার সিনেমার আরও কাছে নিয়ে যাবে। 


প্রথাগত নিয়ম এবং বিকল্প চিন্তার মধ্যে যে বাউন্ডারি সেটিকে আমি ব্লার করে দিতে পছন্দ করি।


জিয়ং সিয়ং ইল

এখন অবধি আপনার সিনেমা সাধারণ দর্শকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়নি। তবে ব্যাড গাই আলাদা। অবশেষে ছবিটা জনপ্রিয়তা পাওয়ায় আপনার অনুভূতি কি?

কিম কি দুক

আমার অনুভুতি? এ নিয়ে আলাদা কোনো অনুভূতি নেই। আমার কাজের বাজার বাড়ছে। আমি মনে করি এই দর্শকদের এক তৃতীয়াংশ আমার ছবি পছন্দ করবে, যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ দর্শক আমার আর কোনো ছবিই দেখতে চাইবে না। ব্যাড গাই’র বিতর্কিত সাবজেক্ট দর্শকদের আমার ছবি থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, এমনকি চিরকালের জন্য। ফলে এ নিয়ে আমার কোনো আলাদা অনুভূতি নেই।

জিয়ং সিয়ং ইল আমার প্রস্তাব ছিল, ইওংসানের এই যৌনপল্লীতে বসে আপনার সাক্ষাতকার নেব। ব্যাড গা্ইয়ের মূল লোকেশানও ছিল এমনই একটা এলাকা। এখন যৌনপল্লীতে বসে কথা বলছি, এ জায়গা নিয়ে আপনার অভিমত কি?

কিম কি দুক যৌনপল্লীও অন্যান্য জায়গার মতোই যেখানে মানুষ কাজ করে জীবিকা আয় করে। তবে একটা বড় পার্থক্য হচ্ছে, এখানে বসবাসরত মানুষগুলো দিনে যে কাজ করে, রাতেও একই কাজ করে। তাদের কাজই তাদের জীবন। শীতল পৃথিবীর মানুষেরা এখানে উষ্ণতা নিতে আসে। এই জগতের চরিত্রগুলোকে আমার সিনেমায় আমি নিয়ে এসেছি কারণ এখানে বাস করা এবং কাজ করা লোকদের জীবন অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। তারা এ গল্পের মৌলিক উপাদান।

জিয়ং সিয়ং ইল

পতিতাবৃত্তিকে আপনি কাজ বলছেন। কোন ভাবনা থেকে এটিকে শ্রম আকারে দেখেন?

কিম কি দুক বেশ কিছু বছর কয়েকটি কারখানায় কাজ করেছি আমি। যদিও সেসব চাকরি খুব ভালো কিছু ছিল না। কিন্তু আমার জন্য সেগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে মনে করতাম। আমার মধ্যে কোনো লজ্জাবোধ ছিল না। কারণ আমি মনে করতাম, কারখানায় কাজ করাই আমার ভবিষ্যত। তো নিজের অতীতের দিকে তাকিয়ে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হিসেবে কেউ যদি কোনো কঠিন জীবনকে বেছে নেয় তাহলে সেটিই তার জন্য বাস্তবতা। সেওংচুল নামে এক নামকরা কোরিয়ান সন্ন্যাসী বলেছিলেন, পাহাড় হচ্ছে পাহাড়। মানে কেউ চাইলে সেটিকে পরিবর্তন করতে পারবে না। তেমনি জীবন হচ্ছে জীবন। মানুষের সচেতন প্রচেষ্টার পরও জীবনে এমন কিছু ঘটে যায় যা অচিন্তনীয়। ফলে কারও প্রতিদিনকার কাজ তার জীবন হয়ে ওঠে, অন্যরা সেটিকে সম্মান বা গ্রহণ না করলেও।

জিয়ং সিয়ং ইল

কোরিয়ান সিনেমাগুলোতে যৌনপল্লীকে নিজস্ব সময়ের প্রতীকী জায়গা থেকে ব্যবহার করা হয়েছে। যখন শুনলাম আপনি এমন সিনেমা বানিয়েছেন, বুঝলাম সমাজ নিয়ে আপনার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এখানে থাকবে।

কিম কি-দুক

মানুষ আমার এ গল্প স্বাভাবিকভাবে নেবে এমনটা আমি আশা করি। এ গল্পের প্রত্যেকটি উপাদান মানে এর ব্যাকগ্রাউন্ড এবং চরিত্রগুলো নেওয়া হয়েছে সত্যিকার একটি জায়গার বাস্তব মানুষ থেকে। আমার সেরাটাই আমি করেছি। এ সিনেমায় কোরিয়ার আমাদের বিভক্ত সমাজকে দেখানো হয়েছে এবং বদ্ধমূল সমাজ ব্যবস্থার নিবিড় সমালোচনা করা হয়েছে। আপনি জানেন, কোরিয়ান সমাজ ব্যবস্থার অনেক কিছুর প্রতি আমার বিশ্বাস নেই। প্রথাগত নিয়ম এবং বিকল্প চিন্তার মধ্যে যে বাউন্ডারি সেটিকে আমি ব্লার করে দিতে পছন্দ করি। টিপিক্যাল কোরিয়ান সমাজে এমন অনেক কিছু আছে, উদাহরণস্বরূপ, অনেক কোরিয়ান অন্যদের বিচার করে শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সামাজিক অবস্থান দিয়ে। একটা নির্দিষ্ট উপায়ে মানুষ আমাকে দেখে। তারা কিন্তু একজন সৃজনশীল সিনেমা নির্মাতা হিসেবে আমাকে নিয়ে কথা বলে না। তারা আমার নিম্ন আর্থ-সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং প্রথাগত শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাব নিয়ে কথা বলে। আমার কঠোর সমালোচক এবং অনুরাগীরাও এই বৈষম্যমূলক চিন্তা নিয়ে সচেতন না হতে পারেন কারণ তারা সামাজিক ব্যবস্থার কেন্দ্রেই বাস করেন। তারা তাদের বৈষম্যমূলক চিন্তা এবং আচরণগুলো লক্ষ্য করে না। নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থান থেকে আসা মানুষও যে অন্য সবার মতোই মানুষ, সেটি দেখিয়ে দেয় ব্যাড গাই। তারা কোনো ভাগাড়ের বর্জ্য না।

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, আর কোনো ইন্টারভিউ দেবেন না। আমি দুঃখিত যে, আপনার কথা আমি ভঙ্গ করিয়েছি।

কিম কি-দুক

আমি মনে করি না এটা ইন্টারভিউ। এটা বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ।

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনার সিনেমার অনেক রিভিউ আপনাকে আহত করেছে। তবে অনেক ক্রিটিক আপনার নতুন সিনেমা ব্যাড গাই নিয়ে কথা বলছেন। সিনে টুয়েন্টি ওয়ানের শেষ সংখ্যায় সাহিত্য সমালোচক জাং কেওয়া-রি এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ পিক স্যান-বিনের ইন্টারভিউ ছাপানো হয়েছে। সিনেমাটিতে আপনার ন্যারেটিভ স্টাইল নিয়ে জাং প্রশ্ন তুলেছেন এবং তার মতে, একেবারে নতুন ফরম্যাট। আপনার সিনেমার ন্যারেটিভ নিয়ে ইনডেপথ স্টাডি আগে কখনো হয়েছে তিনি মনে করেন না। পিক মনে করেন, বেড গাই নিয়ে মনস্তাতিত্ত্বক রিডিং দরকার। তাদের এই মতামতগুলোকে আপনি কীভাবে দেখেন?

কিম কি-দুক

ওই রিভিউগুলোর কারণেই আমি আর কোনো সাক্ষাৎকার দেব না বলেছি। জাং কেওয়া-রি এবং পিক স্যাং-বিনের এই মতামত সুন্দর। আমি সব মতামতকে সম্মান জানাই।

তবে আমি ক্রিটিকদের মধ্যে কাপুরুষতা দেখি এবং আমি মিসকোটেড হতে পছন্দ করি না।

সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি সাক্ষাত্কারে আমার কথাকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং সেগুলোকে আমার বিরুদ্ধেই তারা ব্যবহার করেছে। যেমন, শিম ইয়ং-সিওপ নামে আরেক ফিল্ম ক্রিটিক বলেছেন, আমার মা কোনোভাবেই আমাকে ভালবাসতেন না। আমার পরিবার সম্পর্কে এমন মিথ্যা এবং অপমানজনক কথাবার্তা আমাকে আহত করে। এ ধরনের বক্তব্য কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। আমি আগেই বলেছি, আমার মা ছিলেন নিরক্ষর। আমি এবং আমার ভাইবোনদের জন্য তিনি ছিলেন অসাধারণ একজন মা। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমার কাজ নিয়ে বলতে ব্যাক্তিগত আক্রমণের মতো কিছু করার দরকার নেই।  

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনার সিনেমা নিয়ে রিভিউগুলো পড়তে গিয়ে আমি খুবই অবাক হয়েছি। অনেক তথাকথিত ফিল্ম ক্রিটিক যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী মনে করে, তারা ব্যাড গাইকে না মেটাফোর হিসেবে দেখেছে বা, না কোরিয়ান সমাজের কোনো প্রতীক আকারে দেখেছে। মানুষকে দেখে অবাক লাগে, আপনার সিনেমাকে আরও গভীরভাবে না নিয়ে বরং কড়া প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। কেন ক্রিটিকরা আপনার সিনেমা নিয়ে এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়?

কিম কি-দুক

বাস্তবতার ন্যারেটিভেই আমার কাজকে দেখার মানুষের যে প্রবণতা, এটা ভালো। সিনেমার টেক্সটে যদি বাস্তব চরিত্র নিয়ে একটি বাস্তব গল্প দেখানো হয়, তাহলে সিনেমাকে দেখার এটাই ঠিক উপায়। বাস্তবতাকে দেখার এই সেন্সই ব্যাড গাই-এর অস্তিত্বের কারণ।

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনার সিনেমা দর্শকদের মধ্যে প্রবল ইমোশন তৈরি করে। শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে তাদের ক্ষেপিয়ে দেন।

কিম কি-দুক

এটা সত্য। মেটাফোরকে চিত্রায়ণ করতে আমি মিডিয়াম হিসেবে সিনেমাকে ব্যবহার করি। তবে অনেক মানুষ হয়তো সিনেমার রুঢ় বাস্তবতা দেখতে গিয়ে আমার সেই মেটাফোর দেখে না। আমি কোথাও পড়েছিলাম যে, একজন নির্মাতার উচিত তার কথাকে যতটা সম্ভব সামলে রাখা এবং সিনেমাকে কথা বলতে দেয়া। একজন নির্মাতার উচিত তার লাইফস্টাইল এবং চিন্তা দর্শকদের থেকে আড়াল করে রাখা। আমি মনে করি, একজন ফিলোসফার এবং আর্টিস্টের নিজেকে হাজির করার এটাই ঠিক উপায়। তবে আমি বলছি না যে, আমি একজন আর্টিস্ট।

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনি একজন আর্টিস্ট (হেসে)

কিম কি-দুক

কোনও আর্টিস্টের উচিত নয়, তার চিন্তাকে সরাসরি প্রকাশ করে দেয়া। একইসঙ্গে, মানুষ যদি আমার সিনেমায় মেটাফরগুলো দেখতে পায় সেটি আমাকে আনন্দিত করবে।

জিয়ং সিয়ং ইল

আপনি বলেছিলেন যে, আপনার ব্যক্তিগত ইতিহাস নিয়ে আপনার সিনেমা বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করেন যেসব ক্রিটিক, তাদেরকে আপনি পছন্দ করেন না। আমি আপনার সঙ্গে একমত, এবং আমি সেটা করতে যাচ্ছি না (হেসে)। কিন্তু, ব্যাড গাই আমাকে আপনার বাবার ব্যাপারে ভাবিয়েছে! তিনি কেমন মানুষ ছিলেন?

কিম কি-দুক

আমার বাবা একজন চমৎকার মানুষ ছিলেন, কিন্তু আমার জন্য চমৎকার ছিলেন না। তিনি কোরিয়ান যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন এবং অনেক বছর শারীরিক যন্ত্রণা ভোগেন। আমার বেড়ে ওঠার সময়টাতে তিনি খুব কঠোর ছিলেন। অল্পতেই তিনি খুব রেগে যেতেন, ফলে তার আশেপাশে থাকাটা স্বাচ্ছন্দ্যকর ছিলো না। আমার শেষ সিনেমা ‘অ্যাড্রেস আননোন’ (২০০১)-এ বাবার সেন্ট্রাল ক্যারেকটারটা আমার বাবার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। তারা দুজনই কোরিয়ান যুদ্ধে অংশ নিয়ে গর্ববোধ করতেন। যদিও ত্রিশ বছর পর শেষপর্যন্ত যুদ্ধের সময় তাদের সাহসিকতার কথা স্বীকৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা দুজনই সামাজিকভাবে হেয় হয়েছিলেন। যদিও আমার বাবা আমার সবচেয়ে ভালোটা চাইতেন, আমার দরকার ছিলো তার কাছ থেকে সরে যাওয়া। যাহোক, তিনি আমাকে নৌবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করেছিলেন। বাড়ি ফিরে যাওয়া এড়াবার জন্য আমি সেনাবাহিনীর চাকরি শেষ করে ইউরোপেই থেকে যাই। এখন আমার বাবা আমার কাছে ভালো, এবং আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি বুঝি না, আমার বাবার প্রভাব আমাকে অন্যান্য কাজ থেকে দূরে রেখেছে, এমন কুটিল মন্তব্য কেন ক্রিটিকরা করে। সত্যি কথা হলো, আমি যা করতে চেয়েছি তা করতে কখনোই বাধা দেননি আমার বাবা৷ যদিও তিনি চেয়েছিলেন আমি একটা কারখানার ম্যানেজার হই, আমি এই ধরনের কাজ থেকে পিছু হটে এসেছি  এবং একজন আর্টিস্ট হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে শুরু করেছি।

জিয়ং সিয়ং ইল

আমি আপনার বাবার বিষয়ে জানতে চাইলাম কারণ আপনার সিনেমার অনেক চরিত্রকেই মনে হয় তারা বাবা হতে ভয় পায়। একইসঙ্গে, বাবার সান্নিধ্যও তাদের মধ্যে ভীতি তৈরি করে। উত্তর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বিরাজমান জটিল আদর্শগত বিভেদের মুখোমুখি হতে চায় না এমন মানুষগুলোকেই প্রতিনিধিত্ব করে এই চরিত্রগুলো?

কিম কি-দুক

‘অ্যাড্রেস আননোন’-এর সব চরিত্রের মধ্যেই একটা কিছু খামতি রয়েছে, যেটাকে আমি আধুনিক কোরিয়ান সমাজে বিরাজমান সমস্যাগুলোর একটা প্রতীক হিসেবে ভাবি। আমাদের বাবারা আমাদেরকে এমন একটা সমাজে বড় করে তুলেছেন যেখানে প্রচুর অসংগতি রয়েছে। ‘হ্যান’ মানে কোরিয়ানদের জীবনে গভীর দুঃখবোধ, যেটা ভুলে যাওয়া যায় না, আমাদের বাবার প্রজন্ম থেকে চলে আসছে। যেমন, আমার বাবা এখনো ‘রেড কমিউনিস্ট’ এই নামটা ঘৃণাভরে উচ্চারণ করেন। তিনি যখন দেখেন দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার উত্তর কোরিয়াকে চাল দিচ্ছে, তিনি রেগে যান! খেয়াল করে দেখুন, তিনি উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের দ্বারাই গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন এবং নির্যাতিত হয়েছিলেন। কোরিয়ান যুদ্ধ আমাদের আধুনিক সময়ের সবচেয়ে মারাত্মক এবং চরম অভিজ্ঞতা। এই স্মৃতিগুলো ভুলে যাওয়া তার জন্য কঠিন। যদিও তার শারীরিক যন্ত্রণা লাঘব হয়েছে, মানসিক আঘাতগুলো থেকে তিনি কখনোই সেরে উঠবেন না। আমার বাবার মানসিক পীড়নগুলো আমারও একান্ত হয়ে উঠেছিলো। এই অনুভূতিগুলোর প্রজেকশন আমার সিনেমায় রয়েছে। কোনো না কোনোভাবে আমার বাবার ফেলে আসা অভিব্যক্তি আমার বর্তমান সচেতনতার সাথে মিশে গেছে। এটাই  আমাকে ‘অ্যাড্রেস আননোন’ বানানোর আইডিয়া দেয়।

জিয়ং সিয়ং ইল

কোরিয়ান যুদ্ধ হচ্ছে আপনার বাবার হান বা গভীর দুঃখবোধ, আপনার হান কোনটা?

কিম কি-দুক

আমারটা হচ্ছে, আমি মেইনস্ট্রিম সমাজ বা এর কালচারাল সীমানা কোনোটার সঙ্গেই খাপ খাওয়াতে পারছি না। অন্য কোরিয়ানদের যাদের এমন অবস্থা তারা ইনফিউরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে। ভাগ্যক্রমে, কয়েক বছর আগে আমার ভেতর থেকে এ অনুভূতিটা আমি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি, যখন আমি কোরিয়া ছাড়ি এবং ফ্রান্সে চলে যাই। দেশের বাইরের অভিজ্ঞতা নিজেকে আবিষ্কার করতে আমাকে সাহায্য করেছে। যেসব কোরিয়ান ইনফিউরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে তারা জানে না কোনটা ‘কালচার’ বা কোনটা ‘হাই ক্লাস’। সমাজ থেকে পাওয়া এমন অদ্ভুত জিনিসের মালিকানা দাবি করে বসে থাকে তারা, যেন তারা ফ্যান্টাসির জগতে বাস করছে। তারা মুক্তচিন্তক নয়। আনবায়াসড হয়ে আমার সিনেমা নিয়ে চিন্তা করার মতো স্বাধীন নয় তারা। তারা বলে আমার সিনেমা অদ্ভুত এবং র বা কাঁচা। আমি এই ‘র’ শব্দটা ঘৃণা করি। এটি শুনলে মনে হয় আমার সিনেমা ভালো মতো বানানো না বা উন্নত না।

জিয়ং সিয়ং ইল

শুনতে আপনার কাছে অবাক লাগতে পারে যে, আমার মতে আপনার সিনেমা আপনার ব্যাক্তিগত জীবনের গল্পকে প্রতিফলিত করে। তার মানে এটা না, আপনার সব সিনেমার মেইন ক্যারেক্টার আপনাকে ঘিরেই। আমি আসলে আপনাকে এবং আপনার জীবনকে দেখি সাইড এবং মার্জিনাল ক্যারেক্টারের মধ্যে। যেমন ব্যাড গাই-এ দেখা যায়, হান কি (প্রধান ক্যারেক্টার) যখন নায়িকাকে প্রকাশ্যে চুমু খায়, তিনজন সেনাসদস্য এসে তাকে বেধড়ক পেটায়। আপনি কি আপনার সামরিক জীবনের অতীতকে পছন্দ করেন না?

কিম কি-দুক

আপনার প্রশ্নে দুইটা দিক আছে। আমি নতুন একটা সিনেমার গল্প লিখছি, যার নাম হরাইজন। কোরিয়ান নৌবাহিনীতে থাকাকালীন যন্ত্রণার মাধ্যমে যৌন অভিজ্ঞতা নেওয়ার গল্প এটি। আমাদের শেখানো হতো, একবার নৌসেনা মানে আজীবন নৌসেনা। এ ইতিবাচক কথা আমাদের মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকবে কারণ এটা পরস্পরের প্রতি আমাদের বিশ্বস্ততার বিষয়টা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু এই সামরিক  চরিত্রকে নেতিবাচকভাবেও পড়া যায়। আমরা বলতে পারি, যে তিন সেনাসদস্য হান-কি’কে পেটাচ্ছে তারা আসলে ব্যাড গাই। তারা কিন্তু একজন মানুষকে পিটিয়ে মজা নিয়েছিল। এক্ষেত্রে কাউকে বুলিং করা এবং আহত করা দুইটাই খারাপ কাজ। আমার সিনেমা অনেকটা দর্শকের মিরর ইমেজের মতো। কোনো একটি জায়গা ঠিকই সিনেমাটির সঙ্গে কারও (দর্শক) সম্পর্ককে রিফ্লেক্ট করবে। স্ক্রিনের চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের দেখি এবং নানা উপায়ে তাদের সঙ্গে যুক্ত করি। একজন দর্শক আরেকজন দর্শক থেকে আলাদা এবং এটি বলা কঠিন যে, কার ভাবনা ঠিক এবং কার ভাবনা ভুল।

জিয়ং সিয়ং ইল

শক্তিশালী সাবজেক্টের কারণে আপনার সিনেমা আপনার দর্শকদের বড় অংশকে আলাদা করে দেয়। আপনার সিনেমাগুলো দেখলে কিছুটা বেদনাদায়ক এবং অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা দেয়।

কিম কি-দুক

মানুষ আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমি একজন নৈতিকতাপূর্ণ মানুষ কী না, আমার উত্তর থাকে, না।

আমি এমন একজন মানুষ, কোরিয়ান সমাজের অন্ধকার এবং দুর্বল দিকগুলো দেখাতে যার কোনো ভীতি নেই। এটা আমার নৈতিক জায়গা।

আগের প্রজেক্টগুলো থেকে আরও বেশি নির্মল সিনেমা আমি বানাতে পারতাম, কিন্তু আমার ভয় হয় যে নরমাল কিছু বানানোর জন্য আমাকে দোষারোপ করা হবে। আবার একইসময়ে আমার মধ্যে এ ভীতি কাজ করে যে, ভবিষ্যতে মেইনস্ট্রিম সিনেমা বানানোর জন্য আমার মধ্যে কোনো ক্রিয়েটিভিটি নেই, এর কারণ, আমার ব্যাকগ্রাউন্ড হচ্ছে বিতর্কিত বিষয় নিয়ে সিনেমা বানানো।

জিয়ং সিয়ং ইল

শেষ পয়েন্টটা কি আরও ব্যাখ্যা করবেন?

কিম কি-দুক

আমি চাই, আমার সহায়তা ছাড়াই সমাজ নিজেকে দেখুক, সেটি আসলে কি। কোরিয়াতে যেসব সামাজিক সমস্যা, সেগুলোর দিকে মনোযোগ প্রয়োজন আছে। আমাদের সমাজের অন্ধকার দিকটা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। সমাজ নিয়ে আমার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব আছে, আমার সিনেমা সেটিকেই রিফ্লেক্ট করে।

জিয়ং সিয়ং ইল

ব্যাড গাই-এর শেষ দৃশ্য হচ্ছে, ভ্রাম্যমান পতিতাবৃত্তির ট্রাকটি কাস্টমার সন্ধানে বের হয়। এমন পাপময় একটা দৃশ্যে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে খ্রিস্টানদের গসপেল সঙ্গীত ব্যবহার করেছেন, যেটি গাওয়া হয় নাজাত বা পরিত্রাণের জন্য। আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন যে, আপনার সিনেমার ক্যারেক্টারগুলো নাজাতের ব্যাপারে আরও বেশি আগ্রহী? কিংবা পাপ এবং নাজাতের প্রতি সমানভাবে আগ্রহী? এ শেষ দৃশ্য দেখে মনে হয় অন্য একটা সিনেমার শুরু। সম্ভবত এটি আপনার সিনেমাগুলোকে বোঝার মূল উপায়।

কিম কি-দুক

আমার প্রথম সিনেমা ক্রোকোডাইল (১৯৯৬) থেকে এখন পর্যন্ত সব সিনেমা ধর্মীয় মোটিফ দিয়ে তৈরির চেষ্টা করেছি। এসব মোটিফ হচ্ছে পাপ এবং আত্মদহনের সংমিশ্রণ। মানুষ আমার সিনেমায় কী দেখতে চায়, সেটি তাদের সিদ্ধান্ত। আমি সেটা দর্শকদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিলাম। তবে আমার গল্পগুলোতে ধর্মীয় উপাদানগুলো মাদার নেচার এবং ইনোসেন্সের পথ দেখায়। এই সময়ে আমাদের জীবন কৃত্রিমতায় ভরপুর। ইনোসেন্সকে ফিরে পেতে আমাদের আরও বেশি চেষ্টা করতে হবে। সুতরাং ব্যাড গাই-এর পাপিষ্ট চরিত্রগুলোর ঈশ্বরের বাণী শোনা দরকার।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: