আমার পড়ালেখা – ভিএস নাইপল । তৃতীয় পর্ব ।। ভাষান্তর: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

৩.

ত্রিনিদাদ দ্বীপটি ছোট্ট, মাত্র ১,৮০০ বর্গমাইলের মধ্যে আধা মিলিয়ন মানুষের বসবাস। কিন্তু এই জনসংখ্যার ভেতরেই বহু জাতির মানুষের সংমিশ্রন ঘটেছিল। আবার প্রতিটি জাতির নিজস্ব আলাদা জগতও ছিল।

 স্থানীয় একটি পত্রিকায় চাকরি পাবার পর বাবা আমাদের নিয়ে সেখানকার শহরে চলে এলেন। আমাদের আগের বাড়ির চেয়ে জায়গাটা মাত্র বারো মাইল দূরে হলেও এ যেন এক নতুন দেশে চলে আসা। ছোট্ট ভারতীয় গ্রাম্য জীবন, স্মৃতি থেকে গড়ে তোলা ভারতের এক বিচ্ছিন্ন প্রতিচ্ছবির জীবন ফেলে আমরা শহরে চলে এলাম।  সেই গ্রাম্য আবহাওয়ার জীবনে আমার আর কখনোই ফিরে যাওয়া হয়নি; সেই জগতের ভাষার সাথে আমার সমস্ত সংশ্রব আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়; শহরে চলে আসার পর আর কখনো রামলীলা দেখা হয়নি।

 শহরে  ভারতীয় লোক খুব কম ছিল। রাস্তাঘাটে আমাদের মতো তেমন কাউকে চোখে পড়তো না; নিজেকে সেখানে কেমন যেন অনাহুত আগুন্তুকের মত লাগতো। আমরা যেখানটায় থাকতাম সেখানকার সবকটা বাড়ি গা ঘেঁষাঘেষি করে বানানো। বাড়িগুলোতে সবসময় হৈ চৈ লেগেই থাকতো। যদিও নিজের উঠোনে ব্যক্তিগত পরিবেশ বলতে কিছু ছিল না, তারপরও আমরা আমাদের পুরোনো ধারার নিজস্ব গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকতাম।  চারপাশের নানা জাতির সংমিশ্রণে তৈরি ভিন্ন ঔপনিবেশিক পরিবেশ থেকে আমাদের মানসিকতা আমাদেরকে পৃথক করে রেখেছিলো। বারন্দায় দামী ফার্নের গাছ ঝুলতো এমন কিছু অভিজাত বাড়িও এলাকায় ছিল। তবে বেড়াহীন উঠোনের  সাথে লাগোয়া জরাজীর্ণ বাড়িগুলোর ভিড়ে তা তেমন চোখে পড়ার নয়। শ্রীহীন এই বাড়িগুলোয় বদ্ধ কুঠুরির মতো তিন-চারটা কক্ষ থাকতো। বাড়িগুলো দেখে শত বছর আগেকার দাসদাসীদের আবাসস্থল বলে মনে হতো। এই সব বাড়ির বাসিন্দারা উঠোনের কিছু পানির কল ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতো। এলাকার রাস্তায় সারাক্ষণ লোকজনের কর্কশ কণ্ঠের চেঁচামেচি শোনা যেত: আর বড় রাস্তার একেবারে শেষ মাথায় ছিল বিশাল আকারের মার্কিন সামরিক ঘাটি।

 ওয়র্ম স্যারের ক্লাসে যখন আমি স্থান পেলাম তখন শহরে আমার তৃতীয় বছর চলছে। এই তিন বছরে আমি যতটুকু সম্ভব মুখস্থ বিদ্যা অর্জন করেছি, যা কিছু দেখেছি বা পড়েছি তা মনে রাখার চেষ্টা করেছি। তবে বিমূর্ত ভাবনার সাথে বেঁচে থেকে খুব অল্প বিষয়ই সত্যিকারভাবে বুঝতে পেরেছি। আমার অবস্থা ছিল সিনেমা শোতে আধঘন্টা পরে ঢুকে কাহিনীকে বিচ্ছিন্নভাবে বুঝতে পারা দর্শকের মতো। ইংল্যান্ডে চলে যাবার আগের বারোটা বছর আমার এভাবেই কেটে গিয়েছিলো। সারাক্ষণই নিজেকে এক অচেনা আগুন্তুকের মতো মনে হতো। অন্যসব দলের মানুষদের আমি দলের বাইরে থেকে দেখতাম; স্কুলের বন্ধুদের সাথে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো তা স্কুল আর পথ পেরিয়ে আমার ঘরোয়া জীবনে কখনো প্রবেশ করতে পারেনি। কোথায় আছি সে সম্পর্কে আমার কোন স্বচ্ছ ধারণা ছিল না, তার চেয়ে বড় কথা হলো সে ধারণা খুঁজে বের করার সময় ও সুযোগ কোনটাই আমার হয়নি। কেবল প্রথম উনিশ মাস বাদে সেই বারোটা বছরের বাকিটা সময় আমার অন্ধ ঔপনিবেশিকতাবাদী শিক্ষা গ্রহণে কেটে যায়। এভাবে খুব শীঘ্রই আমি বুঝতে শিখলাম যে আমাদের এই ঔপনিবেশিক জগতটা বাইরের বিশাল জগতের তুচ্ছ এক ছায়ামাত্র। মূলত ইংল্যান্ড সেইসাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা নিয়ে গঠিত এই বিশাল বর্হিজগতই আমাদের ঔপনিবেশিক জগতটাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে। ওই বর্হিজগত থেকেই আমাদের শাসন করার জন্য গভর্নর পাঠানো হয়। দাসপ্রথার যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত যে সস্তা শুকনো খাবার দ্বীপবাসীর জন্য পাঠানো হয়, সেটাও বাইরের ওই জগত থেকেই আসে (এইসব খাবারের মধ্যে আছে স্মোকড হেরিং মাছ, নোনা কড মাছ, জমানো দুধ, তেলে ডুবানো নতুন সার্ডিন)। বিশেষ ওষুধপত্র (ডোর্ডের কিডনির ওষুধ, ডাক্তার স্লোনের মালিশ মলম, ৬৬৬ নামের শক্তিবর্ধক ওষুধ) ওখান থেকেই আমদানি হতো। ওখান থেকে আমাদের কাছে ইংল্যান্ডের মুদ্রাও পাঠানো হতো। অবশ্য যুদ্ধের সময় এই চালানটা বন্ধ ছিল। তখন আমরা কানাডার ডাইম আর নিকেল ব্যবহার করতাম। ইংল্যান্ডের আধা পেনি আর আধা ক্রাউন থেকে আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সেন্ট আর ডলার ব্যবহার করা শুরু করি; আধা পেনির পরিবর্তে এক সেন্ট, এক শিলিংয়ের পরিবর্তে চব্বিশ সেন্ট।

 বাইরের জগত থেকে আমাদের জগতে পাঠ্য বই (যেমন রিভিংটন-এর শিলিং অ্যারিথমেটিক, নেসফিল্ডের গ্রামার) এবং বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও পাঠানো হতো। দ্বীপবাসীদের মানবিক ও কল্পনার চাহিদা মেটানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের  চলচ্চিত্র সেই সাথে লাইফ আর টাইম পত্রিকাও ওখান থেকেই আসতো। ওয়ার্ম স্যারের অফিসে দ্যা ইলাসট্রেটেড লন্ডন নিউজ এর নিয়মিত কপি, এভরিম্যান’স লইব্রেরি, জুলভার্ন’র বই, পেঙ্গুইন প্রকাশনী কলিন্স ক্লাসিক’র বই- সবই আমরা পেতাম ওই বহির্বিশ্ব থেকেই। সর্বোপরি, বাবার মাধ্যমে আমার পড়া সাহিত্য সংকলনগুলোও ঐ জগত থেকেই আনা হতো।

 পূর্বেই বলেছি, আমি নিজে নিজে বইগুলো পড়তে গেলে কিছুই বুঝতাম না। বইয়ের অর্থ বোঝার জন্য যে কল্পনার চাবিকাঠি প্রয়োজন হয় তা আমার ছিল না। এর মূল কারণ আমার সীমিত সামাজিক জ্ঞান। ভারতীয় গ্রাম্য জীবনের দুর্বল স্মৃতি আর আগুন্তুক হিসেবে দেখা মিশ্র ঔপনিবেশিক জগত থেকে যতটুকু আমি শিখেছিলাম তা দিয়ে পৃথিবীর বিখ্যাত সব শহরের প্রেক্ষাপটে রচিত সাহিত্য আমার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকতো। ওই সাহিত্য আর আমার ব্যক্তিগত জগতের মধ্যে বিস্তর ফারাক ছিল। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে যে ইংরেজি পাঠ্যক্রমভুক্ত গল্পগুলো আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারতাম না ( স্প্যারো ইন সার্চ অব এক্সপালশন শিরোনামের গল্পটি তেমনই একটা গল্প ছিল। ওয়ার্ম স্যারের ছোট্ট পাঠাগারে বইটির নতুন আমদানি হয়েছিল)। পরবর্তীতে যখন আমি মাধ্যমিক শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হই (প্রদর্শনী পরীক্ষায় আমি জয়ী হয়েছিলাম), স্কুলের পাঠাগার থেকে নেয়া রোমাঞ্চ বা অভিযান কাহিনীগুলো বুঝতেও আমাকে গলদঘর্ম হতে হতো। যুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ের অভিজাত রীতি অনুযায়ী চমৎকারভাবে চামড়ায় বাঁধাই করা দ্য বুচান, দ্য সাপার, দ্য সাবাতিনি, দ্য স্যাক্স রোহমার প্রভৃতি বইয়ের প্রচ্ছদে সোনালি হরফে স্কুলের সিল মোহর দেয়া থাকতো। এই সমস্ত বইয়ের ভেতর পাঠকদের জন্য যে কৃত্রিম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করা হতো, তার প্রকৃত উদ্দেশ্য আমি বুঝতে পারতাম না। গোয়েন্দা কাহিনীগুলোর প্রতিও আমার একই মনোভাব ছিল (সব গোয়েন্দা কাহিনীতেই একটি সামান্য ধাঁধার উত্তর খুঁজতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে পাঠককে অনেকদূর পর্যন্ত পড়ে যেতে হয়)। আবার অন্যদিকে যখন বিশেষ লেখকদের খ্যাতি সম্পর্কে ধারণা না পেয়েই সাধারণ কাহিনী নিয়ে লেখা ইংরেজি উপন্যাস পড়া চেষ্টা করতাম তখন উপন্যাসের মানুষগুলোর বাস্তবতা, লেখার ধরনের কৃত্রিমতা, পুরো কাহিনীর প্রেক্ষাপটের পেছনের উদ্দেশ্য অথবা পাঠক হিসেবে উপন্যাসের শেষে আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে এই টাইপের একগাদা প্রশ্ন এসে মনে ভিড় করতো। এইরকমের বহুমুখী প্রশ্নের বানে জর্জরিত হয়ে এইসব রচনাবলী থেকে আমি সাহিত্যের প্রকৃত রস আস্বাদনে ব্যর্থ হতাম। মূলত আমার ব্যক্তিগত সাহিত্য সংকলন আর বাবার শিক্ষার গুণে, লেখালেখি সম্পর্কে আমার জ্ঞান গভীরতর হয়। লেখালেখির প্রতি আমার এই মনোভাব জোসেফ কনরাড এর সাথে কিছুটা মিলে যায়। এই মিলটা আমি তখন না বুঝলেও পরবর্তীতে সহজেই আবিষ্কার করতে পারি। কনরাডের লেখা তখন  সবে মাত্র প্রকাশিত হয়েছে। আমার নিজের লেখালেখি অবশ্য কনরাডের লেখার ধরণ এবং বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায় শুরু হয়েছিল। কনরাডের লেখার সাথে নিজের চিন্তা ভাবনার মিল খুঁজে পেতে বেশ সময় লেগেছিলো আমার। কনরাডকে তার এক বন্ধু নিজের লেখা একটি  উপন্যাস পাঠায়। উপন্যাসটিতে অনেকগুলো প্লট বা কাহিনীর কাঠামোর ব্যবহার ছিল। উপন্যাসটি পড়ার পর কনরাড মতামত দেন যে, মানুষের মনের অজানা জগতের রুদ্ধদ্বার খোলার ক্ষেত্রে উপন্যাসটির কাহিনীগুলো ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, উপন্যাসটির প্লট কেবল এমন কিছু কাহিনী জাল একসাথে বুনেছে যাকে সোজা ভাষায় বলা যায় নিছক দুর্ঘটনা। বন্ধুকে লেখা চিঠিতে কনরাড জানিয়েছেন, “কাহিনীর কৃত্রিমতার কারণে পুরো উপন্যাসে চমক আর সত্য বর্জিত হয়েছে, যার কারণে কাহিনীটা অবাস্তব বলে মনে হচ্ছে।”



[চলবে]



প্রথম পর্ব,  দ্বিতীয় পর্ব

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: