home কবিতা আপেল গাছের বেদনা হেরম্ব-কিরিলভ সংলাপ ।। মাহবুব অনিন্দ্য

আপেল গাছের বেদনা হেরম্ব-কিরিলভ সংলাপ ।। মাহবুব অনিন্দ্য

I throw an apple to you and, if indeed you are willing to love me, then receive it and let me taste your virgin charms. But if you are otherwise minded, which heaven forbid, take this very apple and see how short-lived all beauty is.

-Epigrams of Plato

: কিরিলভ, জীবন নিয়ে তোমার পরিকল্পনা কী?
: পরিকল্পনা নেই কোনো। চেয়েছি শুধুই এক আপেলগাছের জীবন।
: তুমি কি আপেলগাছের বেদনা জানো?
: না। জানি না।
: আরেকটা জীবন পেলে কী হতে চাও?
: আপেলগাছ।
: আপেলগাছই?
: হ্যাঁ, একটা আপেলগাছের বেদনা জানতে এরকম তিনটা জীবন দরকার।
: তারপর?
: আর একবার জন্ম নিয়ে আপেলগাছ হতে ইচ্ছে করে।
: ঐ দ্যাখো, কোত্থেকে ছিঁচকে বানরের দল এসে আপেলক্ষেত তছনছ করে গেছে। একটা আধখাওয়া আপেল ছাড়া কিছুই রাখেনি।
: বানর! এরা কারা?
: এরা তো শিশ্নসর্বস্ব ভাঁড়।
: তাহলে?
: বাদ দাও। চলো ঐ দূর আঙুরক্ষেতে বসে মৃত্যু নিয়ে কথা বলি।
: এত তাড়া কেন তোমার?
: তাড়া কই! পাকা আঙুরের দিকে মন চলে যায়।
: আচ্ছা, মৃত্যু নিয়ে কী বলছিলে যেন?
: শুনেছি, মৃত্যুর আগে মানুষের শুধু পেটব্যথা করে।
: একেবারে ভুল শুনেছ। কোথায় গোখরা সাপ আর কোথায় ওকড়ার বন!
: আমার পেট কেমন করছে।
: এখন কিছুতেই মরবে না তুমি।
: মরার কোনো এখন-তখন নেই জানোই তো।
: তা ঠিক, কিন্তু পেটব্যথার কী হবে?
: তুমি বরং এই নিমগাছের ডালে চুপচাপ বসে থাকো।
: এত গাছ থাকতে নিম কেন? নিম কি এর নিরাময়?
: কারণ, এটাই সবচেয়ে কাছের গাছ।
: দেখো, বানরগুলো আবার এসেছে।
: কোথায় বানর, আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। নিমগাছে উঠলে মানুষ অন্য কোনো গাছই দেখতে পায় না। বানর তো দূর অস্ত, শিশ্নসর্বস্ব…
: বানরে আর মানুষে তফাৎ নেই তেমন। আমরা সবাই এক-একটা অতিকায় ভাঁড়। উপরন্তু, মানুষের প্রত্যেকটি ভাঁড়ামির সাথে জড়িয়ে থাকে অসীম ভণ্ডামি আর অতলান্তিক মিথ্যা।
: অতলান্তিক?
: হ্যাঁ, উদয়াস্ত মানুষ তার মিথ্যাকে টেনে নিয়ে  যায়।
: আর আধখাওয়া আপেল?
: সে তো মিথ্যাই। ‘আধখাওয়া আপেল’ যৌক্তিক সত্যে পৌঁছাতে পারে না। তাই এই নামে কোনো ফল হতে পারে না। ওটা আসলে অর্ধেক… আই মিন, শেষ পর্যন্ত আমরা একে আপেলই বলতে পারি। অর্ধেক বা পুরো, খাওয়া কিংবা না-খাওয়া–আপেল সম্পর্কে এরকম কোনো গুণবাচক ধারণা হতে পারে না।

“But you don’t pray yet?”
“I pray to everything. See, there’s a spider crawling on the wall, I look and am thankful to it for crawling.”
His eyes lit up again. He kept looking straight at Stavrogin, his gaze firm and unflinching. Stavrogin watched him frowningly and squeamishly, but there was no mockery in his eyes.

-Fyodor Dostoyevsky, Demons

: তাহলে?
: আর কোনো প্রশ্ন নয়, আপেলও নয়। এবার তোমার কথা বলো।
: আমার কথা?
: হ্যাঁ, তোমার কথা বলো। তবে তার আগে ঐ প্রশ্নচিহ্ন সরাও।
: প্রশ্ন?
: প্রশ্নসূচক চিহ্ন। কানে কম শোনো?
: কান?
: হ্যাঁ, কান।
: কিসের কান?
: কানের কান।
: এটা আবার কী?
: এটা কিছু না।
: কিছু না কী?
: কিছু না।
: তাহলে?
: তাহলে কিছু না।
: তাহলে কিছু না-টা কী?
: তাহলে কিছু না-টা কিছু না।
: ‘এসব কী হচ্ছে, কিরিলভ?’
: ‘কর্ঙখল কর্ঙখল’।
: ‘কর্ঙখল’?
: হ্যাঁ।
: না।
: হ্যাঁ।
: না।
: না।
: হ্যাঁ।
: না।
: হ্যাঁ।
: না।
: না।
: হ্যাঁ না হ্যাঁ না না না না না।
: না হ্যাঁ না হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ।
: এগুলো কী হচ্ছে?
: এগুলো হাসপাতাল হচ্ছে।
: হাসপাতাল?
: হ্যাঁ, হাসপাতাল হচ্ছে।
: কিসের?
: দেখছো না কাটাছেঁড়া হচ্ছে, রক্তারক্তি হচ্ছে।
: এখানে রক্ত এল কোত্থেকে?
: কাটাছেঁড়া হলে রক্ত আসবে না? রক্ত কি তোমার শাশুড়ি নাকি?
: কার সাথে কী! কিসের সাথে ঘি!
: কী?
: ঘি।
: কী?
: ঘি।
: ঘি?
: হি।
: হি?
: সি।
: হিসি?
: ইই।
: সিসি?
: ইসি।
: কিসি?
: ঘিসি।
: হিসিকিসি, ঘিসিকিসি?
: ইসিসিসি, সিসিইসি।
: ‘এসব কী হচ্ছে, কিরিলভ?’
: এসব ঠুটো জগন্নাথ হচ্ছে।
: জগন্নাথ?
: হ্যাঁ, জগন্নাথ।
: আর ঠুটো?
: ঠুটো সিম্পলি একটা ছিদ্র, ফুটো।
: ফুটো?
: হ্যা, ঐ ফুটো দিয়েই তো আকাশ দেখা যায়।
: এত বড় ফুটো?
: নাহ্। এত ছোট ফুটো।
: তাতেই আকাশ দেখা যায়?
: হ্যাঁ, আকাশ তো দেখা যায়ই। তার সাথে দেখা যায় মেঘে ঢাকা তারা, কোমলগান্ধার, হীরক রাজার দেশে। অপু-দুর্গা দেখা যায়, অদ্রে হেপবার্ন দেখা যায়, মঙ্গলগ্রহ-জঙ্গলগ্রহ থেকে শুরু করে দাম্পত্য কলহ কিছুই বাদ যায় না।
: ‘দাম্পত্য কলহ’ কী জিনিস, কিরিলভ’?
: ধরো একটা মাঠ…
: ধরলাম।
: মাঠে খুব যুদ্ধ হচ্ছে।
: ডগফাইট?
: ধুর! ফাইট-টাইট না, যুদ্ধ। তোমাকে ধরতে বললাম ধরো।
: ধরেছি।
: কী ধরলে?
: যুদ্ধ।
: যুদ্ধ ধরা যায় না।
: তাহলে?
: কল্পনা করো।
: আচ্ছা।
: মনে করো বিরাট এক মাঠ।
: বিরাট এক মাঠ।
: মাঠে যুদ্ধ হচ্ছে।
: কিসের যুদ্ধ?
: নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের যুদ্ধ।
: তারপর?
: নিঃশ্বাস নিচ্ছে, নিঃশ্বাস ছাড়ছে।
: তারপর?
: নিঃশ্বাস ছাড়ছে, নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
: কে?
: কেউ না।
: তারপর?
: তারপর কলিজা ফেটে গেল।
: কার?
: একজনের।
: তারপর?
: আরেকজনের কলিজা ফেটে গেল।
: তারপর?
: তারপর মরে গেল।
: কে?
: একজন।
: তারপর?
: আরেকজন।
: তারপর?
: রক্ত।
: কার?
: একজনের।
: তারপর?
: আরেকজনের।
: তারপর?
: খুনের মামলা।
: কে করল?
: একজন।
: তারপর আরেকজন আরেকটা মামলা করল, এই তো?
: হ্যাঁ।
: মৃত মানুষ মৃত মানুষের নামে মামলা করতে পারে?
: মৃত মানুষ মৃত মানুষকে খুন করতে পারলে মামলা তো মামুলি ঘটনা।
: তা ঠিক।
: কী ঠিক?
: কিছুই ঠিক না।
: তাহলে আপেল?
: ঠিক না।
: আঙুরক্ষেত, সূর্যাস্ত, মিথ্যা?
: ঠিক না।
: বানর?
: ঠিক না।
: শিশ্নসর্বস্ব ভাঁড়?
: এটা চলতে পারে।
: কী?
: শিশ্নসর্বস্বতা।
: কার?
: সবরকম ভাঁড়ের।
: আর কার?
: মিথ্যার।
: আর?
: শাশুড়ির।
: ইইসিসি সিসিইই?
: রূপকার্থে।
: কিসের রূপক?
: হিংসার।
: আর?
: হিংস্রতার।
: কিসি?
: লোভের।
: ঘিসি?
: মৃত্যুর।
: থাম্ বেটা।
: কী?
: Stoppit.
: আহা।
: কী?
: বুঝি নাই।
: থামতে বলেছি।
: অ হ।
: ‘এসব কী হচ্ছে’?
: কিছু না, নিমগাছ হচ্ছে।
: নিমগাছ?
: হ্যাঁ, নিমগাছ।
: কিসের নিমগাছ?
: নিমফলের নিমগাছ।
: তারপর?
: নিমফুলের নিমগাছ।
: তারপর?
: তারপর ছেলেবেলার নিমগাছ।
: তারপর?
: তারপর বড়বেলার নিমগাছ।
: তারপর?
: তারপর মাঝবয়সী নিমগাছ।
: তারপর?
: নিমপাতার নিমগাছ।
: তারপর?
: নিমগাছের ছালের নিমগাছ।
তারপর কি নিমকাঠের নিমগাছ?
: হ্যাঁ।
: কী হ্যাঁ?
: ঐ নিমকাঠ হ্যাঁ।
: ঐ নিমকাঠ হ্যাঁ কী?
: ঐ নিমকাঠ হ্যাঁ কিছু না।
: তাহলে?
: তাহলেও কিছু না।
: কিছুই কিছু না?
: না।
: কী?
: সবকিছুই কিছু।
: সবকিছুর মধ্যে কী-কী আছে?
: সবকিছুর মধ্যে কী-কী আছে না-খুঁজে চলো আমরা সবকিছুর মধ্যে কী আছে খু্ঁজি।
: কী আছে?
: মানুষের ভাগ্য আছে।
: এছাড়া?
: কর্মফল আছে।
: আধখাওয়া আপেল?
: না।
: ইই কিসি?
: আপেলের ধারণা আছে।
: আপেল দেখতে কেমন?
: আপেল দেখতে আপেলের মতো।
: আপেল দেখতে আপেলের মতো কেন?
: সে তো তার মতোই হবে।
: কার মতো?
: তার নিজের মতো।
: নিজের মতো জিনিসটা কী?
: আত্মনং স্মরণং গচ্ছামি।
: আত্ম কী বস্তু?
: অপরের অপর।
: অপর কী?
: আয়নার উল্টা পিঠ।
: সবকিছুই আয়না?
: হ্যাঁ, সবই আয়না।
: মানুষ?
: মানুষও দিব্যি আয়না। কিন্তু সেই আয়নায় মানুষ নিজেকেই দেখতে পায় না। মানুষ জীবনভর তার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
: সফল মানুষ আছে কি?
: না।
: কেন?
: সফলতা প্রথমত কাঠঠোকরা পাখিকে প্রতীকায়ন করে। তারপর মাছরাঙা, জিরাফ, মাকড়সা, বটগাছ, জবাফুল…
: জবাফুল দিয়ে কী করে?
: গুলি করে। খুন করে। জানো তো, জবাফুলকে আমরা একপ্রকার লাল বন্দুক ভাবতাম। ছোটবেলায় আমরা এই বন্দুক দিয়ে মাছ শিকার করতাম। মাছেরা খুব জবা ভালোবাসত আর জলের তল থেকে টুপ করে উঠে গুলি খেত কিন্তু মরত না, বরং আনন্দে নাচতে-নাচতে তীরের কাছে এসে বলত, আমার শর্টগান কোথায়, আমার বড়শি কোথায়? কোথায় আমার ছিপ-ঘুড়ি-নাটাই?
: তারপর?
: তারপর আমার খুব জ্বর হলো একবার। কাশতে-কাশতে বুক থেকে রক্ত এল। রক্ত থেকে ফুটল থোকা থোকা নান্দনিক জবাফুল। তারপর পাকা গমের ক্ষেত ভয়ানক তছনছ হলো। নদীতে ঘরিয়াল ভেসে উঠল। ফুলচোরের মেয়ের সাথে বাগানমালিকের ছেলের বিয়ে হলো। এরপর ধীরে-ধীরে বাগান উজার হতে থাকল। এ-নিয়ে তুমুল ঝগড়া লাগল টুনটুনি ও ঘুঘুদের। ঘুঘুরা খুবই ঘাগু প্রকৃতির হওয়ায় তারা টুনটুনিদের একইসাথে ঘুঘু ও ফাঁদ দুটাই দেখিয়ে দিতে চাইল। টুনটুনিরা চুপচাপ তাদের ‘ভালো বন্দুক’ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
: তারপর?
: আমি মরে গেলাম।
: তারপর?
: সে মরে গেল।
: তারপর?
: নিমগাছটিও মরল।
: তারপর?
: আমার গল্পটি শেষ হলো।


মাহবুব অনিন্দ্য
জন্ম: ডিসেম্বর, ১৯৮৪ জন্মস্থান: পাটেশ্বরী, কুড়িগ্রাম।
পড়ালেখা: স্নাতকোত্তর (গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা)
পেশা: শিক্ষকতা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত বই:  ঘাসফুল অপেরা (২০১৬, চৈতন্য), অপার কলিংবেল (২০১৮, বেহুলা বাংলা)
সম্পাদনা: আরশিনগর (কবিতার কাগজ)

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য