‘আধুনিক’ কবিতার অনাধুনিক প্রেক্ষাপট | আল মাহমুদ

যারা সোভিয়েত রাশিয়াকেই তাদের সৃজনশীল কর্মের অর্থাৎ সাহিত্য-শিল্পের আদর্শ কেন্দ্ররূপে গণ্য করতেন, তারা কি বিগত সত্তর বছর ধরে বাংলায় এমন কোনও কাব্য রচনায় সমর্থ হয়েছিলেন যাকে একাডেমিক বিচারেও অন্তত ‘প্রোগ্রেসিভ’ বলা যায়?


আমি মাঝে-মধ্যে কবিসভায়, কবি সম্মেলনে, কবিতার আসরে আমার সাধ্যমতো বর্তমানকালের সাহিত্যের পরিস্থিতি ব্যাখ্যার প্রয়াসী হয়ে থাকি। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে এসে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সংকুচিত চিত্তে তরুণ কবিদের বলতে চেষ্টা করি, আমরা যতই সাম্প্রতিক কবিতার প্রশংসা করি না কেন, প্রকৃতপক্ষে আধুনিক বাংলা ভাষার আঙ্গিক, গঠনরীতি যথেষ্ট আধুনিক নয়। এ কথা বলা মাত্র আমি লক্ষ্য করেছি, অনেক প্রতিভাবান তরুণ কবির চেহারা বিমর্ষ হয়ে যায়। প্রবীণ ও খ্যাতিমান কবিরাও যে আমার কথা সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেন এমন মনে হয় না। তারা আমাকে এসব কথা বলতে নিরুৎসাহিত করেন আকার-ইঙ্গিতে।

আমি যে আমাদের কবিতাকে অনাধুনিক বলছি তারা অবশ্য তা নিজেরাও অল্প-বিস্তর বুঝতে পারেন। কিন্তু আমার কথায় তরুণদের উৎসাহ-উদ্দীপনা খানিকটা উদ্যমহীন হয়ে যাওয়ার ভয়েই সম্ভবত আমাকে সংযত হওয়ার পরামর্শ দেন। অথচ আমার বয়স আমাকে এখন এমন এক জায়গায় এনে পৌঁছে দিয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে আমি প্রকৃত সত্যকে আড়াল করতে পারি না। করা উচিতও ভাবি না।

‘আধুনিক’ শব্দটির অর্থ যে সাম্রাজ্যবাদ এবং ঔপনিবেশিক দাসত্বের সঙ্গেই সম্পর্কিত, এখন এ কথা কে না জানে? আমি আবার ঠিক উত্তরাধুনিকতার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সঙ্গেও ঐকমত্য পোষণ করি না, সেটাও এখানে বলে রাখা জরুরি মনে করি।

প্রকৃতপক্ষে ইরাক আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই সাহিত্যের এদেশীয় তাত্ত্বিকদের অনেক দিনের বিশ্বাস ও আদর্শগত আস্থা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের পক্ষে এতকাল যেসব লেখক-কবি ও বুদ্ধিজীবী তাদের একটা গোটা জীবন ব্যয় করে দিয়েছিলেন, তারা তাদের সৃজনশীল সাহিত্য-শিল্পের দিক-নির্দেশনা নিয়ে একটু দ্বিধায় পড়ে যান। এখানে আমার বক্তব্য হলো এই দ্বিধাটা কী ও কেন? যারা সোভিয়েত রাশিয়াকেই তাদের সৃজনশীল কর্মের অর্থাৎ সাহিত্য-শিল্পের আদর্শ কেন্দ্ররূপে গণ্য করতেন, তারা কি বিগত সত্তর বছর ধরে বাংলায় এমন কোনও কাব্য রচনায় সমর্থ হয়েছিলেন যাকে একাডেমিক বিচারেও অন্তত ‘প্রোগ্রেসিভ’ বলা যায়? মহামতি ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন বলেছিলেন, তার কাছে মায়াকোভস্কির কবিতার চেয়ে পুশকিনের কবিতাই অধিকতর মধুরতম মনে হয়- এই ইঙ্গিতটিও তো আমাদের দেশের ‘প্রোগ্রেসিভ’ তথা প্রগতিবাদী লেখকগণ বুঝতে সক্ষম হননি। অথচ এ দেশে গত পঞ্চান্ন বছরে যত সাহিত্যালোচনা হয়েছে এর সবটুকুই করে গেছেন মার্কসবাদী লেখক-সমালোচকগণ। আমি অবশ্য স্বীকার করি, গোপাল হালদার থেকে শুরু করে নরহরি কবিরাজের মতো ধীশক্তিসম্পন্ন মার্কসীয় সাহিত্য পণ্ডিতদের সমকক্ষ কোনো বুর্জোয়া বা প্রতিক্রিয়াশীল লেখক, কবি বা সমালোচক তখন বাংলা ভাষার চৌহদ্দিতে থাকলেও তারা ছিলেন কোণঠাসা। কারণ যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকেই বাঙালি কমিউনিস্টরা শ্লেষাত্মক মনোভাব নিয়ে গ্রহণ করব কি করব না বলে দ্বিধান্বিত ছিলেন এবং অতি উৎসাহী মার্কসবাদী তরুণ কবি বিষ্ণু দে-কে বুর্জোয়া লেখকদের অভ্যাস আক্রান্ত বলে আক্রমণ করেছিলেন তাদেরই প্রকাশিত ‘মার্কসবাদী’ পত্রিকায়, সেখানে অকমিউনিস্ট প্রতিক্রিয়াশীল কবিদের অবস্থাটা কেমন ছিল তা বিবেচ্য। তিরিশের সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশের উদ্ভব হয়েছিল মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে। তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছিলেন এবং যুদ্ধের শেষ দিকে পরাজিত অক্ষশক্তির আত্মসমর্পণে উন্মুখ অবস্থায় জাপানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক হামলার পরিণাম দেখলেও নাগাসাকি ও হিরোশিমা ধ্বংসের তেজস্ক্রিয়তার কোন আঁচ তাদের গায়ে লাগেনি। তদুপরি তাদের সৃষ্ট আধুনিক বাংলা কাব্যের অস্থিতেও কোনো লিউকেমিয়া ক্যান্সার বাংলা কবিতার পাঠকগণ প্রত্যক্ষ করেননি। তাদের ইউরোপিয়ানা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো ছিলো মূলত অপ্রগতিশীল, অকমিউনিস্ট এবং জীবনাচরণে তারা ছিলেন অ-বাঙালি। এসব কবির আয়োজনে অনেক কিছু থাকলেও হৃদয়ের গভীরে কোনও ‘দেশ’ বা ‘দেশপ্রেম’ ছিল না। অবশ্য ইতিপূর্বে আমি কোনো এক প্রবন্ধে তিরিশের কয়েকজন প্রধান কবির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ব্যর্থ প্রয়াসের কথা উল্লেখ করেছিলাম। ষাট পেরোবার পর একটি স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি ভালবাসার আকাঙ্ক্ষা তাদের মনে জেগে উঠেছিল সত্য কিন্তু কেউ-ই বাংলাদেশে ফিরতে পারেননি। ব্যতিক্রম শুধু কবি জীবনানন্দ দাশ। তিনি ইউরোপীয় কবিতার বিশেষ করে ইয়েটস এ অ্যাডগার অ্যালেন পো’র কবিতার ভেতর থেকে দেশজতা, আঞ্চলিকতা, শব্দের অসাধারণ শক্তি এবং উপমার অবিশ্বাস্য উপস্থাপন প্রক্রিয়া আয়ত্ত করে বরিশালে অবস্থান করতেন। তিনি বরিশালে থেকেই ইউরোপীয় কাব্যের মর্মমূলে প্রবেশ করেছিলেন বলে একটা স্বদেশভূমি সজল, সজীব এবং ধূসর বৈপরীত্য নিয়ে তার হৃদয়কে কবিত্বের রসে সতেজ ও সবুজ রেখেছিলেন। তিনি কখনো বাংলার এই ভাটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌরভ বিস্মৃত হননি। যদিও তিনি তিরিশের একই নৌকার যাত্রী। পার্থক্য ছিল এই যে, তিনি প্রথম জীবনে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তার অনুকরণে ঝরা পালক কাব্যগ্রন্থটি রচনা করেন। কালের সাহিত্যের বিচারে এটি একটি অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ। পরবর্তীকালে এ বইটির কথা তার সমালোচকগণ তেমন গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেননি। এছাড়া তার ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যের মধ্যেও কোনো নাগরিক স্বভাবই ছিল না। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি দু’টি চিত্র যা তিনি কলকাতায় দেখেছিলেন বা জানতেন তা সঠিক এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে আমাদের আধুনিক বাংলা কবিতায় মর্মস্পর্শী চিত্রকল্পে উপস্থাপন করে গেছেন।


আধুনিক বাংলা ভাষার দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা কাজী নজরুল ইসলামকেও শুধু অবজ্ঞাই করেননি, অত্যন্ত ধূর্ততার সঙ্গে তার ধূমকেতুর মতো আবির্ভাবকে অপমান করতেও চেয়েছিলেন। পারেননি শুধু ততদিনে বাংলার মুসলমানগণ ভারতের ভাগ করার দাবিতে কলকাতা শহরকে রক্তের চিহ্নে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছিলেন। যা রেডক্লিফ রোয়েদাদে পরবর্তীকালে একেবারেই মুছে ফেলা হয়।


তিরিশের কবিরা যুদ্ধোত্তর বাংলা কবিতায় যে বদল ঘটিয়েছিলেন, তা তাদের আবির্ভাব না ঘটলেও ঘটা অবশ্যাম্ভবী ছিল। কারণ রবীন্দ্রনাথের পর নজরুলের আগমণ যতটা বৈপ্লবিক ঘটনা হিসেবে বাঙালি জাতির কাছে প্রতিভাত হয়েছিল (হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে) তিরিশের কবিরা তা ঘটাতে পারেননি। তাদের আবির্ভাবকালে তারা রবীন্দ্রনাথকে যেমন পাশ কাটিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তেমনি বিদ্রোহী কবিতার উদ্ভাবক কবি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং আধুনিক বাংলা ভাষার দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা কাজী নজরুল ইসলামকেও শুধু অবজ্ঞাই করেননি, অত্যন্ত ধূর্ততার সঙ্গে তার ধূমকেতুর মতো আবির্ভাবকে অপমান করতেও চেয়েছিলেন। পারেননি শুধু ততদিনে বাংলার মুসলমানগণ ভারতের ভাগ করার দাবিতে কলকাতা শহরকে রক্তের চিহ্নে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছিলেন। যা রেডক্লিফ রোয়েদাদে পরবর্তীকালে একেবারেই মুছে ফেলা হয়। তা না হলে অর্ধেকটা কলকাতা তো পূর্ববাংলার চাষী মুসলমানদেরই পাওনা ছিল। দেশ ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হলে কেউ কেউ যেমন শ্রদ্ধেয় ইসলামী চিন্তাবিদ তৎকালীন সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র আন্দোলনের নেতা আবুল হাশিম ও নেতাজী সুভাষ বসুর ভাই শরৎ বসুর ঐকান্তিক প্রয়াসও ব্যর্থ হয়। বাংলাকে ভাগ না করার জন্য শেষ চেষ্টা যা পাকিস্তান ও ভারতের বাইরে একটি আলাদা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অখণ্ডত্ব দান করতে পারত। কিন্তু তা কংগ্রেস নেতাদের অসম্মতির ফলে সম্ভব হয়নি। হয়নি যে সেটা ছিল বাঙালি মুসলমান ও হিন্দুদেরও সৌভাগ্যের সূচক। আমি ধারণা করি, এটা ছিল বাঙালি মুসলমানদের প্রতি এক ধরণের অলৌকিক এবং এক নিগূঢ় নির্দেশের মতো।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে আধুনিক বাংলা সাহিত্য স্বভাবে এবং চরিত্রে নিঃসন্দেহে ছিল ইউরোপীয় সামন্তবাদী ও ঔপনিবেশিক দেশগুলোর প্রতি দাসত্বের গৌরবে উদ্দীপিত। বুর্জোয়া মানবতাবাদ প্রকৃতপক্ষে কোনো অবস্থাতেই মানবজাতির কাব্যের উপযোগী বিষয় ছিল না। তবু তারই প্রশংসায় পঞ্চমুখ হওয়ার নামই ছিল আধুনিকতা। অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাবের পেছনে ছিলেন যোশেফ স্ট্যালিন। সন্দেহ নেই সারা পৃথিবীর নির্যাতিত মানুষ, সামন্তবাদী দাসত্ব, সামাজ্রবাদী লুণ্ঠনে রক্তশূন্য এবং মহামানবতা স্ট্যালিনের মুখের দিকে তার মোটা গোঁফের পৌরুষ উজ্জ্বল দৃঢ়তার পানে হা-পিত্যেশ করে তাকিয়ে ছিল। মনে রাখতে হবে বলশেভিকরা কোনোদিন কোনো অবস্থাতেই প্রকৃত শ্রমিক শ্রেণির একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম ছিলেন না। স্ট্যালিন কোনোদিন কোনো অবস্থাতেই তার দলের নির্দেশে কোনো সমাজতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের দিকে অগ্রসর হননি। তিনি সাহিত্য-শিল্প-মানুষের হৃদয়বৃত্তির, কোনো মননশীল উদ্ভাবনায় বিশ্বাস করতেন না। তার আমলে অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও স্বাধীনচিন্তার অধিকারী উদ্ভাবক মানুষকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হতে হয়েছিল। যাদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়েছিল বন্দি অবস্থায়। এখানে আমি ইচ্ছা করলে আলেকজান্ডার সোলঝিনেৎসিনের ‘ফার্স্ট সার্কেল, গুলাগ আর্কিপিলেগো’ ও ‘ক্যান্সার ওয়ার্ড’ থেকে অনেক দৃষ্টান্ত দিতে পারতাম। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি এ দেশের অনেক আত্মত্যাগী মার্কসিস্ট, যারা আলেকজান্ডার সোলঝিনেৎসিনের নামটিও সহ্য করতে পারেন না। যেমন ধ্রুব সত্যকে ও কঠোর বাস্তবতাকে কোনোদিনই এ দেশের প্রগতিবাদীরা এবং তথাকথিত আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রবক্তারা হজম করতে পারেননি।

আমি মনে করি কমিউনিস্ট ইশতেহারের কোনো একটি প্রতিশ্রুতিও আজ বাস্তবে পরিণত হয়নি। তাছাড়া একবিংশ শতাব্দীর গত চার বছরে পুঁজিবাদ ও নব্য ওয়ার্ল্ড অর্ডারের প্রবক্তারা পৃথিবীর কোথাও কোনো কমিউনিস্ট আদর্শের বিপরীতে রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘর্ষে লিপ্ত আছেন এর কোনো বিশ্বস্ত প্রমাণও নেই। অন্তত আমাদের দেশে কোনো কমিউনিস্ট পার্টিই প্রকাশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান দখল ও ইরাক যুদ্ধের বিপরীতে কোনো প্রতিবাদী সমাজতান্ত্রিক বিশ্লেষণ খাড়া করতে পারেননি। এমনকি একটি ক্ষুদ্র আন্দোলন বা মিছিলও তারা করতে পারেননি। তাদের সমর্থক লেখকদের কাব্যে-উপন্যাসে এবং প্রবন্ধে এমন কোনো মানবিক প্রতিবাদী বিষয়ও তারা উদ্ভাবন করতে পারছেন না। অথচ তাদের কলম তো বন্ধ নেই!

আমি অবশ্য এদের সৃজনশীল ও মননশীল রচনাকে আবর্জনা বলে লাতিন আমেরিকান কবি-সাহিত্যিকদের মতো অবজ্ঞা করতে চাই না। কারণ আমি জানি তারা প্রকৃতপক্ষেই একদিন মানবজাতির এবং বিশ্বপ্রকৃতির সমর্থনে দাঁড়াবেন। সময়টা খুবই নিকটে।


আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, আমাদের এখনকার কবিতা যথেষ্ট আধুনিক নয়।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে নির্বিচারে নর-নারী ও শিশু হত্যা করে চলেছে। প্রকৃতপক্ষে এই গণহত্যাই মানবজাতির চোখ খুলে দিয়েছে। কোনো প্রগতিবাদী কিংবা সমাজতান্ত্রিক চিন্তার আগামী মস্তিষ্কগুলো এটাকে শুধু সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন হিসেবেই দেখতে চাইছেন মাত্র। কিন্তু এ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদ লুণ্ঠনের লড়াই-ই নয়। এ লড়াই শুরু হয়েছে সর্ব অর্থেই বিশ্ব লুণ্ঠনের এবং সমগ্র মানবজাতিকে দাসত্বের শৃঙ্ক্ষলে আবদ্ধ রাখতে। নানা পরিস্থিতির বিপাকে পড়ে পশ্চিমা বিবেকবান বুদ্ধিজীবীরা এ যুদ্ধের কোনো সার্বিক বিশ্লেষণ এখনো খাড়া করতে সক্ষম হননি। যদিও নিন্দাবাদ অনুচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু প্রতিবাদ উচ্চারিত হচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতার মোহমুক্ত বিশ্বের কয়েকজন কবির কণ্ঠেই। তারাই চিৎকার করে বলেছেন, এই যুদ্ধ হলো মানব জাতির সভ্যতা-সম্ভ্রম-শান্তি-স্বস্তি ও ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে। বহুদিন যাবত ধিক্কার, ঘৃণার, সন্দেহের ভীতি কাটিয়ে ইসলাম শব্দটি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে প্রবেশ করেছে। তারা ইসলাম শব্দটিকে যতটা ভয়াবহ হিসেবে গণ্য করে এসেছে এখন আর ততটা ভীতিকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। কিংবা এই নিরস্ত্র শব্দটির মধ্যেই রয়েছে কোনো অলৌকিক ভূমিকম্প বা বা বিশ্বলুণ্ঠনের , দাসত্বের এবং মানব সভ্যতা বিনাশের বিরুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিতে নিগূঢ় ইঙ্গিত দিচ্ছে। সবাই বুঝতে পারছে ভয়াবহ মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে ততোধিক ভয়াবহ মারণাস্ত্র প্রয়োগ করে এ অবধ্য দানবকে ধরাশায়ী করা যাবে না। এই দৈত্যের প্রাণভোমরা যেখানে যে মানবসমুদ্রের আধ্যাত্মিক আদর্শের কৌটায় সংগুপ্ত আছে, সেখানেই তাকে পিষ্ট করে মানুষের ঘৃণার মধ্যে নিক্ষেপ করতে হবে, ডুবিয়ে দিতে হবে।

একালের পরমাধুনিক কবিকূল বিশ্বের সর্বত্রই এটা উপলব্ধি করছেন। এই উপলব্ধির সঙ্গে আমাদের সাম্প্রতিক কবিতা একাত্ম হতে পারছে না বলেই আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, আমাদের এখনকার কবিতা যথেষ্ট আধুনিক নয়।


  • প্রথম প্রকাশ: ১০ জুন, ২০০৫, কালের খেয়া সূচনা সংখ্যা

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: