অ্যা লাভ লেটার টু ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর | প্রিয়ম

স্ট্যানলি কুব্রিক বলেছিলেন, সিনেমাতে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন তা বড় বিষয় নয়। আপনি কী ফিলোসফি পোর্ট্রে করছেন তাও বিবেচ্য বিষয় নয়। আসল বিষয় হলো আপনার স্টোরি বা সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য মিউজিকের সাথে যাচ্ছে কী না।

ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। যা ফিল্ম স্কোর, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, ফিল্ম সাউন্ডট্র্যাক, ফিল্ম মিউজিক, স্ক্রিন কমপোজিশন, স্ক্রিন মিউজিক, আবহ সংগীত, ইনসিডেন্টাল মিউজিক বা আরো কিছু নামে পরিচিত।

সিনেমার আদিযুগে স্কোর ছিলনা। ছিল প্রজেক্টরের ঘরঘর শব্দ। সে সময় অর্থাৎ নির্বাক সিনেমার শৈশবাবস্থায় পিয়ানো বা অর্গ্যান বাজানো হত। যেমন ধরেন আইজেনস্টাইনের ‘পোটেমকিন’ সিনেমাতে জার্মান কম্পোজার এডমুন্ড মাইজেলের স্কোর।

পরে সবাক যুুগে স্কোর ভালভাবেই তার জায়গা দখল করে নেয়।

 

এ সময়ে সিনেমার রীতি প্রকৃতির পরিবর্তন অনেক দ্রুতগামী। বিষয়বস্তুর পরিধি বেড়েছে অনেক এবং এর প্রভাব পড়েছে সিনেমার প্রত্যেক উপাদানে- স্কোরেও। ফলে স্কোরের ঢং, এর ব্যাপ্তি, এর কায়দা-কানুন অনেকখানি বদলে গেছে। আজকাল সিনেমার মেজাজ তৈরী হয় স্কোরের উপর বা সিনেমার মেজাজ অনুযায়ী স্কোরের রূপ নির্ধারিত হয়।

আবার স্কোরের উপরেই সিনেমা পুরোপুরি নির্ভরশীল তাও নয়। অনেক সিনেমাতে সচেতনভাবে স্কোর বর্জন করা হয়েছে। ১৯৫০ এর দিকে অনেক সিনেমা আসে যাতে মিউজিক বর্জন করা হয় এবং তা রিয়েলিজম নামক এক আন্দোলনে রূপ নেয়। সে সময়ের পরিচালকদের মতে- বাস্তব জীবনে আসলে কোনো সঙ্গীত নেই। আমাদের জীবনে যখন কোনো আনন্দদায়ক, বেদনাদায়ক অথবা সাধারণ কোনো ঘটনা ঘটে তাতে আসলে কোনো মিউজিকের সঞ্চরণ হয় না।

অবশ্য এ ধারণা বেশিদিন টিকেনি। কিন্তু এ ধারণাকে আমরা পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারি না। কারণ স্কোরের আধিক্যের ফলে সিনেমার মেজাজ নষ্ট হয়ে যায় এবং এর রস আস্বাদনে ব্যাঘাত ঘটে।

কিছু সিনেমাতে দেখা যায় স্কোর থাকলেও তা সিনেমার অর্ধেকের বেশি সময় ছিল অনুপস্থিত। অনেক কম্পোজারের মতে, সিনেমার কোনো দৃশ্যে খুব বেশি যেখানে দরকার শুধু সেখানেই স্কোর দেয়া উচিত। আবার কিছু ক্ষেত্রে কম্পোজার প্রোটাগোনিস্টের পারফরম্যান্সের উপর ভিত্তি করে স্কোর দেন। যে জায়গাগুলোতে প্রোটাগোনিস্টের পারফরম্যান্স দুর্বল সে জায়গাতে কম্পোজার তার স্কোর দিয়ে সিনেমার গুন টেনে ধরেন। পারতপক্ষে যেখানে একদমই স্কোরের দরকার নেই তারা সেখানে স্কোর দিতে চান না।

পুনশ্চঃ স্কোর দিয়ে সিনেমার দুর্বলতা ঢাকা যায় না।


ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর মানেই হলো ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে থাকা। এর উচিত নয় ফরগ্রাউন্ডে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।


কম্পোজারের আগে পরিচালকের উপর গুরুদায়িত্ব পড়ে তিনি তার সিনেমার জন্য কী ধরনের স্কোরের মেজাজ তৈরি করতে চান।

অনেক সিনেমাতে দেখবেন খুব নির্দিষ্ট কিছু জায়গাতে স্কোর আসছে। যখনই ডায়লগ আসছে স্কোর একেবারেই বন্ধ। এবং আমি একদমই স্কোরের প্রয়োজন বোধ করি না। হয় কি, এসময় যদি আপনি স্কোর দেন তাহলে সিনেমার যে মেজাজ, তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।

স্কোর দিয়ে দর্শককে ম্যানিপুলেট করা যায় খুব সহজেই। নিম্নমানের স্ক্রিপ্ট, বাজে পরিচালনা, খারাপ এক্টিং এসব ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয় স্কোর দিয়ে। ভাল হাসির দৃশ্য না হওয়ার পরও আপনি হাসছেন কারণ অনেক চড়া ভলিউমে হাসির কিউ (Cue) দেয়া হয়েছে স্কোরে। চড়া ভলিউমে এক্সিডেন্টাল স্কোর দিয়ে বারবার আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও দৃশ্য হিসেবে তা খুবই দুর্বল। আর আমরা বোকার মত রিয়েকশন দিতে থাকি আর আকর্ষিত হতে থাকি এসব দৃশ্যে। আমি এর আগে বলেছি স্কোর দিয়ে সিনেমার দুর্বলতা ঢাকা যায় না। কিন্তু এক্ষেত্রে দর্শকের উপরও দায়িত্ব বর্তায়। কারণ সচেতন দর্শকমাত্রই (আমার ধারণা) ম্যানিপুলেট হবেন না। আর কালের বিবর্তনে আজকে না হলেও কালকে সিনেমার দুর্বলতা বেরিয়ে আসবে।

উডি অ্যালেনের এক সিনেমাতে দেখেছিলাম এসব সিনেমাকে নিয়ে মক (Mock) করতে। উনি বারবার যে সাউন্ড মিক্স করছে তাকে বলছেন হাসির ভলিউম কমাতে, নয়তো কেউ উনার জোক বুঝতে পারবে না। কিন্তু ওই লোক ভলিউম বাড়ানোর পিছনে যুক্তি দেখান- যত হাসির স্কোর বাড়ানো হবে তত মানুষ হাসবে।

 

স্কোর সংগীতের ব্যাকরণ মানে না। তবে সিনেমার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে সময়ের আবর্তনে স্কোরের কিছু ব্যাকরণ তৈরি হয়ে গেছে।

যেমন: Counterpoint, Supra-reality, Underscoring, Realistic Music, Source Music, Characterization, Foreshadowing and Accompaniment, In-congruence and Ironic Contrast ইত্যাদি। এগুলো বাদ দিয়েও আরো অনেক নতুন ধারা যুক্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে এসব বিষয় লিখে বোঝানো কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় এবং এভাবে বোঝানো উচিতও নয়। আপনি প্রাথমিকভাবে বই পড়ে কোনো মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন। কিন্তু বাজানোতে পারদর্শিতা লাভ করতে পারেন না। যেমন কাউন্টারপয়েন্ট শব্দটা শুনলেই আমার মনে পড়ে হিচককের ‘ভার্টিগো’র কথা। ভার্টিগো সিনেমাটির একটি স্কোর আছে ডি’আমোর। কাউন্টারপয়েন্টের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ এটি।

আসলে, পার্টিকুলারলি সিনেমার যে দৃশ্যে স্কোরটি আমরা শুনি সে অংশ দেখে কেউ বোঝালে ব্যাপারটা আপনার জন্য সহজ হবে। এখানে শুধু কাউন্টারপয়েন্ট সম্পর্কে কিছু বলার চেষ্টা করছি। বলা হয়ে থাকে সিনেমাতে ইনটেন্স এবং একই সাথে টেনশন গ্রো করার জন্য কাউন্টারপয়েন্ট ব্যবহৃত হয়। এতে ‘ক’ নোটকে ‘খ’ নোটের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। এতে হয় কি সামান্য ইনটেনসিটি তৈরি হয়। পরে ধীরে ধীরে ‘ক’ নোটকে ‘গ’ নোটের বিরুদ্ধে, ‘ক’ নোটকে ‘ঘ’ নোটের বিরুদ্ধে এবং ‘ক’ নোটকে ‘ঙ’ নোটের মুখোমুখি (এভাবে অনেকক্ষণ চলতে পারে) হতে হয়। এভাবে আস্তে আস্তে টেনশন, কিউরিসিটি, ইনটেনসিটি বাড়তে থাকে। (বাড়তে থাকে অবচেতন মনে। সিনেমা যেহেতু ভিজ্যুয়াল মাধ্যম, সিনেমা দেখার সময় আমাদের মস্তিস্কের ইনটেলেকচুয়াল অংশটি স্কোরে সাধারণত ব্যবহৃত হয় না। এতে ব্যবহৃত হয় আমাদের নন-ইনটেলেকচুয়াল অংশটি।) সবশেষে দৃশ্য অনুযায়ী স্কোরটি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে বা সবধরনের ইনটেনসিটি একটি নির্দিষ্ট নোটকে লক্ষ্য করে তাতে মিশে যেতে থাকে।

 

 ৫                                                  

অনেক পরিচালক নিজে কোনো সময় দেন না। সেক্ষেত্রে পরিচালক কম্পোজারকে স্ক্রিপ্ট এবং সিনেমাটি দিয়ে দেন এবং সবকিছু কম্পোজারের উপর ছেড়ে দেন। আবার কিছু পরিচালক তাদের সাথে ইন্টার‌্যাক্ট করেন।

কম্পোজাররা বলে থাকেন সব পরিচালক সাইলেন্স ব্যবহার করতে চান না। আবার কেউ কেউ চান। কারণ সিনেমার জন্য সাইলেন্স খুবই প্রয়োজনীয় একটি উপাদান।

যখন পরিচালক দেখেন যে তার সিনেমার কোনো দৃশ্য দুর্বল তখন কম্পোজারকে স্কোরের সব মসলা দিয়ে তাকে স্পাইসি করে তুলতে বলেন।

একদা এক সময় কোনো কম্পোজারকে একটি সিনেমা দেয়া হয় স্কোর তৈরি করবার জন্যে। তিনি স্কোর দিয়ে প্রথমবার এর মুড তৈরি করে দেন রোমান্টিক জনরার। পরে পরিচালকের পছন্দ না হওয়ায় দ্বিতীয়বার অন্যরকম মুড তৈরি করেন। এবার সিনেমাটি ডকুমেন্টারি জনরার হয়ে দাঁড়ায়। পরে পরিচালকের নির্দেশে কম্পোজার দুইটি জনরার সমস্বত্ত মিশ্রণ ঘটান।

 

সব কম্পোজার স্বীকার করেন যে স্কোরের ক্ষেত্রে তারা অনেক ধরনের অদ্ভুত অদ্ভুত গবেষণা করে থাকেন। এবং এ গবেষণার সূত্র অনুযায়ী হাতের কাছে যা কিছু আছে চেয়ার, টেবিল, কলম, খাতা যাই হোকনা কেন, সবই মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে ব্যবহার্য। (ফলি সাউন্ডের ক্ষেত্রে যেমন হয়।) অর্থাৎ স্কোরের বেলাতে এর প্রক্রিয়া গৌণ। ফলটাই মূখ্য। কার্যসিদ্ধির জন্য আপনি যেকোনো জিনিস ব্যবহার করতে পারেন।

স্কোরের বেলাতে একটা জিনিস বারবারই বলব যে আপনি যদি কোনো কম্পোজারকে স্কোর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন তিনি অনেকভাবে আপনাকে বুঝাতে চেষ্টা করে শেষে ব্যর্থ হবেন। কারণ স্কোর একই সাথে খুবই লজিক্যাল এবং একই সাথে ইলজিক্যাল একটা ব্যাপার। আপনি নিজে যদি দীর্ঘদিন স্কোর নিয়ে কাজ করেন কেবলমাত্র তখনই এই প্যারাডক্স আপনার মাথায় ভালভাবে ঢুকবে। যেমন: সিনেমার লোকেশন অনুযায়ী স্কোরের পরিবর্তন হয়। ক্যারেক্টার অনুযায়ী পরিবর্তন হয়। প্রত্যেক সিনেমার একটি কাল, পরিবেশ এবং সময় থাকে- যার দ্বারা স্কোরের পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ সূক্ষ্ণ যেকোনো কারণ দ্বারা স্কোর প্রভাবিত হয়।

ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর মানেই হলো ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে থাকা। এর উচিত নয় ফরগ্রাউন্ডে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। কম্পোজাররাই বলে থাকেন এটি আন্ডারলেয়িং একটি জিনিশ। এবং ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরে একজন কম্পোজারের রয়েছে গবেষণা করার অবাধ সুযোগ। কম্পোজাররা বলে থাকেন ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর তৈরি করার ক্ষেত্রে তাদের উপর চাপ কম থাকে। যেরকম চাপ গান তৈরি করার ক্ষেত্রে থাকে। মূল কারণ ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর মার্কেটিং তথা বিক্রিযোগ্য নহে।                                                       

একজন মিউজিক কম্পোজারকে আমরা একজন সাইকোলজিস্টের সাথে তুলনা করতে পারি। অন্তত স্কোরের বেলাতে।  তারা অবচেতন মনের সাথে এত সূক্ষ্ণ ও গভীরে কাজ করে যে তা না দেখলে বোঝা সম্ভব না। মিউজিশিয়ানদের মতে এটি একটি আনথ্যাংকফুল জব। স্কোরের ক্ষেত্রে যেটা হয় মানুষের কাছে এটি সবসময় অবহেলিত হয়েছে। সত্যিকার অর্থে কারো কাছে এর কোনো মূল্যে নেই।

পরিশেষে, স্কোর সিনেমার অন্তর্নিহিত অনেক মৌল, অনেক যৌগ তুলে আনে যা অনেক সময় এক্টিং, ডায়লগ বা সিনেমার অন্যান্য উপাদান পুরোপুরি তুলে আনতে পারে না।

 

(এখানে আমার ইচ্ছা ছিল অনেক সিনেমা, পরিচালক এবং কম্পোজরের নাম উল্লেখ করব। আমি যাদের স্কোর দ্বারা প্রভাবিত। আমার মনে হয়েছে আপনাদের দরকার নেই।)

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: